অধ্যায় ১
ত্রিভুজের ভেতর এক নতুন দেশ
১৯৭১ সালের ৮ই জুলাই, ভরদুপুর। হেনরি কিসিঞ্জার ইসলামাবাদে নামলেন। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি কিসিঞ্জারের এশিয়া সফরের একটি পর্ব, সায়গন থেকে ব্যাংকক হয়ে দিল্লি ঘুরে পাকিস্তান, কিন্তু তলে তলে অন্য কিছুর পরিকল্পনা চলছিল। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে নব্বই মিনিটের বৈঠকের পর কিসিঞ্জার হঠাৎ 'অসুস্থ' বোধ করা শুরু করলেন। সেই অসুস্থতার ছলে তাঁর সফরসূচি বদলে ফেললেন। বলা হলো, কিসিঞ্জার বিশ্রামের জন্য পাহাড়ি শহর নাথিয়াগালিতে যাচ্ছেন। বাস্তবে তিনি রাতের অন্ধকারে চাকলালা বিমানবন্দর থেকে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে রওনা দিলেন বেইজিংয়ের পথে। ৯ থেকে ১১ জুলাই, এই তিনদিন কিসিঞ্জার চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইয়ের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করলেন।
এই গোপন বৈঠক বিংশ শতাব্দীর কূটনীতির ইতিহাসে অন্যতম বড় ঘটনা হিসেবে জায়গা করে নেয়, এখান থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দুই দশকের বৈরিতা ভাঙার পথ খুলে। কিসিঞ্জার-চৌ এন লাইয়ের গোপন বৈঠক এই বইয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অন্য কারণে। তিনদিনের ঐ আলোচনায় দক্ষিণ এশিয়ার একটি সংকট নিয়েও কথা হয়েছিল। সেই সংকটের কেন্দ্রে ছিল একাত্তরের বাংলাদেশ, যেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে একটি মুক্তিযুদ্ধ চলছে, মুজিব বন্দী পাকিস্তানের কারাগারে। এই বৈঠকের সূত্র ধরে এগুলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের জন্মের প্রশ্নটা কেন শুরু থেকেই একটি আঞ্চলিক ঘটনার চেয়ে অনেক বড় কিছু ছিল।
পুরো ঘটনাপ্রবাহ ভালোভাবে বুঝতে চলুন আরও কয়েক বছর পেছনে ফিরে যাই। ১৯৬২ সাল, যখন ভারত ও চীনের মধ্যে একটি সীমান্তযুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধের পর দুই দেশের সম্পর্ক বহু বছরের জন্য শীতল হয়ে যায়, যার জের ধরে পরবর্তী এক দশকে একটি নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়– চীন ভারতকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শুরু করে। অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের পুরনো বৈরিতার কারণে চীনের কাছে পাকিস্তান পরম মিত্র হয়ে ওঠে। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে এই মিত্রতার প্রথম বড় প্রমাণ দেখা যায়, সেই সময় চীন সিঙ্কিয়াং সীমান্তে সেনা সমাবেশ করে ভারতের ওপর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করে।
চীন-পাকিস্তানের পুরনো মিত্রতার প্রেক্ষাপটেই ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ সংকট শুরু হয়। মার্চ মাসে পাকিস্তান যখন বাংলাদেশে সামরিক আগ্রাসন শুরু করে, চীন প্রথম থেকেই পাকিস্তানের পাশে দাঁড়ায়। ২৩শে মার্চ, পাকিস্তানের জাতীয় দিবসে, চৌ এন লাই ইয়াহিয়া খানকে পাঠানো অভিনন্দন বার্তায় পাকিস্তানের জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ে চীনের অবিচল সমর্থনের কথা ব্যক্ত করেন। এপ্রিলের মাঝামাঝি এই অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চৌ এন লাইয়ের একটি চিঠি ইয়াহিয়া খানের কাছে পৌঁছায়। সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের সংকটকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে অভিহিত করা হয় এবং একই সাথে, ভারতকে সেই অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানানো হয়। করাচির সংবাদপত্রে সেই চিঠি ছাপা হয়েছিল একাত্তরের এপ্রিলেই।
চীন ও পাকিস্তানের এই ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজের একটি বড় পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছিলো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের মাধ্যমে। ১৯৬৯ সাল থেকেই ইয়াহিয়া ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের একটি গোপন চ্যানেল হিসেবে কাজ করছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাকিস্তান তখন নিছক মিত্র দেশ না; বরং চীনের দরজা খোলার চাবিকাঠি। ষাটের দশকের শেষে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে। দুই কমিউনিস্ট শক্তির মধ্যে রেষারেষিতে সীমান্ত সংঘর্ষও হয়েছিল। নিক্সন ও কিসিঞ্জার এই ফাটলকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সুবিধায় কাজে লাগাতে চাইলেন। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে সোভিয়েত ইউনিয়নকে চাপে রাখা যাবে, আর একটি সাংঘর্ষিক ত্রিভুজের মধ্যে ওয়াশিংটন সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। কিন্তু এই ত্রিভুজ দাঁড়িয়ে ছিল একটি চতুর্থ স্তম্ভের ওপর– পাকিস্তান। আর পাকিস্তান নামক সেই স্তম্ভের শক্তি নির্ভর করছিল তার ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর। এই বাস্তবতা মাথায় নিয়ে চলুন আবারও ফিরে যাই কিসিঞ্জারের ইসলামাবাদ হয়ে বেইজিংয়ের সেই গোপন সফরে।
১০ই জুলাই, ১৯৭১। কিসিঞ্জার ও চৌ এন লাইয়ের বেইজিং বৈঠকের দ্বিতীয় দিনে দক্ষিণ এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। দুজনেই মনে করতেন, বাংলাদেশের প্রতিরোধের পেছনে ভারতের হাত আছে এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ইয়াহিয়া সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে দিচ্ছে। চৌ এন লাই স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘ভারত যদি নিজের পথে চলতে থাকে, তাহলে চীন পাকিস্তানের পাশে দাঁড়াবে।’ এই কথোপকথন পরবর্তীতে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঐতিহাসিক নথিপত্রের সংকলনে প্রকাশিত হয়। এই একটি বৈঠকের নথিই দেখিয়ে দেয়, বাংলাদেশের জন্মের প্রশ্নটি কেন শুধু দক্ষিণ এশিয়ার একটি আঞ্চলিক ঘটনা ছিল না। ওয়াশিংটন ও বেইজিং যখন একে অপরের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছিল, ঠিক তখনই তাদের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম পাকিস্তান নিজের অস্তিত্ব-সংকটে খাবি খাচ্ছিল। পাকিস্তান ভেঙে গেলে শুধু একটি মিত্র দেশই দুর্বল হয়ে পড়ত না; নতুন করে গড়ে ওঠা এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভও ভেঙে পড়ত। নিক্সন প্রশাসন তাই বাংলাদেশ সংকটে পাকিস্তানের পক্ষেই ঝুঁকে ছিল।
নিক্সনের এই নীতির বিরুদ্ধে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই প্রবল প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ঢাকার মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড আর তাঁর সহকর্মীরা এপ্রিল মাসে ওয়াশিংটনে একটি প্রতিবাদী তারবার্তা পাঠান, যা কি না পরবর্তীতে ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে পরিচিতি পায়। ব্লাড টেলিগ্রামে আর্চার নিক্সন প্রশাসনের কৌশলগত নীরবতাকে ‘নৈতিক ব্যর্থতা’ বলে অভিহিত করেন। সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি-ও একাত্তরের আগস্টে ভারতের শরণার্থী শিবির সরেজমিনে পরিদর্শন করে পাকিস্তানে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবি তোলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত হয় ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’, যেখানে সাধারণ মার্কিন নাগরিকেরা বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ান। ওদিকে সকল জনমত অগ্রাহ্য করে, ডিসেম্বরে যুদ্ধের একেবারে শেষ পর্যায়ে, পাকিস্তান সমর্থনের প্রতীকী প্রদর্শন হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার পারমাণবিক শক্তিচালিত রণতরী ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ বঙ্গোপসাগরে পাঠায়। অর্থাৎ, নিক্সন-কিসিঞ্জারের নীতি সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রের একরৈখিক অবস্থান ছিল না। প্রশাসনের ভেতরে যেমন মতভেদ ছিল, তেমনি মার্কিন সমাজেও বাংলাদেশ প্রশ্নে তীব্র বিভাজন দেখা দিয়েছিল। কিসিঞ্জারের সিদ্ধান্ত পুরো যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং ক্ষমতার কেন্দ্রের একটি সংকীর্ণ বৃত্তের সিদ্ধান্ত ছিল। পরবর্তী অধ্যায়গুলোর বিশ্লেষণ বুঝতে এই পার্থক্যটি মনে রাখা জরুরি।
একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান লজ্জাজনকভাবে পরাজিত হলো। বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। কিসিঞ্জারের কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশে এটি ছিল একটি বড় পরাজয়। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রধান যে দেশটিকে অখণ্ড রাখতে চেয়েছিলেন, সেটি ভেঙে গেল। আবার, ভারত নামের যে শক্তি এই ভাঙনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল, সেই ভারত যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল।
সেই বৈশ্বিক বাস্তবতায়, ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ফিরলেন। যুক্তরাষ্ট্র তখনো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। তাই ঢাকায় তাদের পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস ছিল না; ছিল শুধু একটি কনস্যুলেট জেনারেল, যার প্রধান ছিলেন হার্বার্ট স্পিভাক। ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রদূত ছিলেন, কিন্তু বাংলাদেশে ছিলেন না। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান তখনো কতটা অনিশ্চিত ছিল!
ফেব্রুয়ারির শেষে বঙ্গবন্ধু সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরের সিদ্ধান্ত নিলেন। সোভিয়েত যাত্রার আগে, ২৬শে ফেব্রুয়ারি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ স্পিভাকের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি জানান, মস্কো যাওয়ার আগে বাংলাদেশ সরকার ‘স্বীকৃতি’র প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান জানতে চায়। ঢাকায় মার্কিন কনস্যুলেটের ভবিষ্যৎও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরের ওপর নির্ভর করছে। সামাদ আরও জানান, মস্কোর সঙ্গে যে ধরনের সম্পর্ক গড়ে উঠবে, তা ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব চান না, আরেকটি পরাশক্তির অবস্থান সম্পর্কে কোনো অস্পষ্টতা রেখেই সেই নতুন সম্পর্ক গড়ে উঠুক।
স্পিভাক এই বার্তা জরুরি ভিত্তিতে ওয়াশিংটনে পাঠান। মস্কো সফরের আগে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একটি বিস্তারিত আলোচনার অনুমতিও চান তিনি। বার্তাটি হোয়াইট হাউসে কিসিঞ্জারের দপ্তরে পৌঁছায়। তবে আলোচনার অনুমতি দেওয়া হলো না, আর স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতির প্রশ্নেও কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলো না। সে সময় প্রেসিডেন্ট নিক্সন চীন সফরে ছিলেন। ওয়াশিংটন জানায়, স্বীকৃতির প্রশ্নটি নিক্সনের সফর শেষে বিবেচনা করা হবে। ওয়াশিংটনের এই কালক্ষেপণের মধ্যেই, মুজিব মস্কো রওনা দিলেন ২৯শে ফেব্রুয়ারি।
মার্চের শুরুতে স্পিভাক নিজেই ওয়াশিংটনকে লিখলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের ধৈর্যের সীমা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। স্বীকৃতি ছাড়া এই কনস্যুলেট চালানো ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠছে।’ তখন স্পিভাককে সাময়িকভাবে ওয়াশিংটনে ডেকে আনার প্রস্তাব দিলেন ওয়াশিংটনের এক কর্মকর্তা। উদ্দেশ্য ছিল মার্চের শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়া, যাতে বাংলাদেশের কাছে এমন কোনো বার্তা না পৌঁছায় যে তাদের চাপেই যুক্তরাষ্ট্র স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় ১৯৭২ এর ৪ঠা এপ্রিল।
এই ঘটনাক্রম থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর মস্কো সফর নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য সফর ছিল না; এটি ছিল কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের একটি হাতিয়ার। ওয়াশিংটন সেই চাপ ঠিকই অনুভব করেছিল। তবে একটি কথা বলে রাখা দরকার। মূল নথিতে ‘সোভিয়েত ব্লকে চলে যাওয়া’– এই শব্দবন্ধ হুবহু নেই; বরং আছে বাংলাদেশ-সোভিয়েত দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের একটি নতুন ধারা গড়ে ওঠার আশঙ্কা। তবে অর্থ প্রায় একই।
বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক চাপে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি না হয় মিললো। কিন্তু আস্থার সম্পর্ক কি তৈরি হলো? রাষ্ট্র পরিচালনায় শেখ মুজিবের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি ঝোঁক, ভারত-সোভিয়েত ঘনিষ্ঠতা ইত্যাদি সবকিছু মিলিয়ে ওয়াশিংটনে, বিশেষ করে কিসিঞ্জারের মনে, মুজিবের প্রতি এক ধরনের অস্বস্তি থেকেই গেল।
স্বাধীনতার পরপর, বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের ২৯শে মার্চ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এগারোশো’র বেশি পাকিস্তানি সেনাসদস্যের বিচারের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। বি. জেড. খসরু তাঁর বইয়ে দাবি করেন, পাকিস্তানি সেনাদের বিচার বাংলাদেশের মাটিতে না করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ব্যবহার করে নব্যস্বাধীন বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। ১৯৭৪ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়। সেই চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দির বিচার থেকে সরে আসতে সম্মত হয়; বিনিময়ে পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের এই চাপের পেছনে ছিল তাদের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ। বাংলাদেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্পন্ন হলে পাকিস্তানে তীব্র জনরোষ সৃষ্টি হয়ে ভুট্টো সরকারের পতন ঘটতে পারে– ওয়াশিংটনের আশঙ্কা ছিল এমনই। সেই সময় ভুট্টো সরকারের পতন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী ছিল। তাই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র পাকিস্তানের স্থিতিশীলতা রক্ষার স্বার্থে বাংলাদেশকে নিজের ন্যায়বিচারের দাবি থেকে সরে আসতে হয়। এটি ছিল বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের ওপর ওয়াশিংটনের চাপের আরেকটি উদাহরণ, ১৯৭৪ সালের খাদ্য সাহায্য বিতর্কেরও আগে।
বাংলাদেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক ছক প্রসঙ্গে ১৯৭১ সালের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের কথাও উল্লেখ করা দরকার। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনীর স্থানীয় সহযোগী ‘জামায়াতে ইসলামী’ তাদের তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতাকর্মীদের নিয়ে ‘আলবদর বাহিনী’ গঠন করে। কুখ্যাত এই বাহিনী যুদ্ধের শেষদিকে তালিকা ধরে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও লেখকদের তুলে নিয়ে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর নাম উঠে আসে। যুদ্ধ শেষে উদ্ধার হওয়া রাও ফরমানের ব্যক্তিগত ডায়েরিতে বহু বুদ্ধিজীবীর নাম পাওয়া যায়। সেই একই ডায়েরিতে দুজন মার্কিন নাগরিকের নামও ছিলঃ হেইট ও ডুসপিক। নামের পাশে লেখা ছিল ‘ইউএসএ’ এবং ‘ডিজিআইএস’। হেইট ১৯৫৩ সাল থেকে মার্কিন সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীতে যুক্ত ছিলেন, আর ডুসপিক ছিলেন সিআইএ’র এজেন্ট। ষাটের দশকে ইন্দোনেশিয়ায় গণহত্যার প্রসঙ্গেও তাদের দুজনের নাম উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে অবমুক্ত নথি থেকে সেই গণহত্যায় সিআইএর সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে জানা যায়। যদিও এই তথ্য থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে– সিআইএ সরাসরি বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দিয়েছিল। তবে এটি অন্তত ইঙ্গিত দেয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তগুলোতেও মার্কিন গোয়েন্দা বলয়ের একটি উপস্থিতি ছিল। আর ইসলামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনকে হত্যার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পরিচিত কৌশল বাংলাদেশে দেখা গিয়েছিল ১৯৭১ সালেই; ১৯৭৫ সালের চার বছর আগে।
তবে বাংলাদেশকে নিয়ে মার্কিন সরকারের অস্বস্তির সবচেয়ে নিষ্ঠুর বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৭৪ সালে। সে বছর বন্যায় বাংলাদেশে খাদ্যসংকট তীব্র হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের পিএল-৪৮০ খাদ্যসহায়তা কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশের গম পাওয়ার কথা ছিল। বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন সে বছর কিউবার কাছে ৫০ লক্ষ ডলারের পাটের বস্তা বিক্রি করে। কিউবার সাথে এটি বাংলাদেশের এককালীন লেনদেন ছিল, কোনো স্থায়ী বাণিজ্যিক সম্পর্ক নয়। পিএল-৪৮০ কর্মসূচির নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ কিউবার মতো কালো তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য করলে খাদ্যসহায়তা বন্ধ রাখা হবে। ১৯৭৪ সালের ২৭শে মে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ সরকারকে এই শর্তের কথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন। এরপর বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত খাদ্যসহায়তা স্থগিত হয়ে যায়।
তবে অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান পরে এই ঘটনাকে নিছক নিয়মের কড়াকড়ি হিসেবে দেখেননি। তাঁর মতে, এটি ছিল বাংলাদেশ সরকারের উপর সরাসরি চাপ, সরকারের টিকে থাকার সক্ষমতার উপর আঘাত। খাদ্যাভাবে দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে মরিয়া বাংলাদেশ সরকার কিউবার সঙ্গে ভবিষ্যতে আর কোনো বাণিজ্য না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তারপরও খাদ্যসহায়তার চুক্তি সই হতে প্রায় এক বছর সময় লেগে যায়। ততোদিনে দুর্ভিক্ষের সবচেয়ে ভয়াবহ সময় পেরিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্যসহায়তায় কালবিলম্বই যে দুর্ভিক্ষের একমাত্র কারণ, তা না। দেশের ভেতরের মজুতদারি আর বণ্টনব্যবস্থার ব্যর্থতাও চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী। কিন্তু ঠিক সংকটের মুহূর্তে বহিঃশক্তির চাপ একটি বার্তাই স্পষ্ট করে– বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি ওয়াশিংটনের পছন্দমতো না চললে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণকে তার মূল্য দিতে হবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র যে পুরোপুরি বৈরী ছিল না– এটাও মনে রাখা দরকার। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠন কর্মসূচিতে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত UNROD (UN Relief Operations Dhaka) এ যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় দাতা দেশগুলোর একটি হয়ে ওঠে। ১৯৭২ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রাপ্ত ৭৯৭ মিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক সাহায্যের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একাই দেয় ২৬৩ মিলিয়ন ডলার; অর্থাৎ মোট সাহায্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ১৯৭৩ সালে ভারতকেও ছাড়িয়ে সবচেয়ে বড় দাতা হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র; তাদের মোট সাহায্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩১৮ মিলিয়ন ডলার। বলাবাহুল্য, এই উদারতার পেছনে নিছক মানবিকতা ছিল না। স্নায়ুযুদ্ধের যুগে যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল সদ্য স্বাধীন দেশ বাংলাদেশ যেন সোভিয়েত শিবিরে পুরোপুরি ঢুকে না পড়ে। বাংলাদেশ সোভিয়েত শিবিরে ঢোকেনি, কিন্তু পশ্চিমা শিবিরেও পুরোপুরি ঢোকেনি। এই সম্পূর্ণ নতজানু না হওয়াটাই সম্ভবত ওয়াশিংটনকে ক্ষুব্ধ করেছিল। একদিকে সাহায্য দিয়ে কাছে টানার প্রয়াস, আবার অন্যদিকে সাহায্য আটকে রেখে শাস্তি দেওয়া– যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল বাস্তবায়নের একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
বঙ্গবন্ধু নিজে একাধিকবার এই টানাপোড়েনের কথা প্রকাশ্যে বলেছেন। ১৯৭২ সালের ৩১শে জানুয়ারি, ঢাকা স্টেডিয়ামে মুজিব বাহিনীর অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানে, বঙ্গবন্ধু মার্কিন জনগণ, সাংবাদিক আর সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডির মতো নেতাদের ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি নিক্সন প্রশাসনের সমালোচনাও করেন। কারণ, গণহত্যার খবর জানা সত্ত্বেও নিক্সন প্রশাসন পাকিস্তানকে একাত্তরে অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে। ১৯৭৪ সালের ৪ঠা মার্চ, কুমিল্লা সেনানিবাসে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির প্রথম ব্যাচের কুচকাওয়াজে দেওয়া ভাষণে, বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে পরাশক্তিগুলোর দৃষ্টি এড়াতে পারে না। বাংলাদেশ কার্যত আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি উত্তপ্ত আসনে বসে আছে।’ সেই বছরেরই ২৫শে সেপ্টেম্বর, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া আরেক ভাষণে, শেখ মুজিব এই কথাগুলো আরও বিস্তৃতভাবে বলেন। সেই ভাষণে মুজিব জোটনিরপেক্ষতা আর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি ঘোষণা করেন। ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরকে শান্তির এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যাতে এই অঞ্চল পরাশক্তিদের সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে না ওঠে। তাঁর এসব বক্তব্যের মূল সুর ছিল একটিই– বাংলাদেশ সব দেশের সহযোগিতা নিতে প্রস্তুত, সহযোগিতা তার দরকারও; কিন্তু সেই সহযোগিতা যেন নিজের সার্বভৌমত্ব বা আত্মমর্যাদা বিকিয়ে দিয়ে না হয়। একটি ক্ষুদ্র, দরিদ্র ও সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের নেতা হয়েও মুজিব নিজের দেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে যে স্তরের সচেতনতা দেখিয়েছিলেন, সেটিই সম্ভবত তাঁকে ওয়াশিংটনের কাছে আরও অস্বস্তিকর করে তুলেছিল। কারণ শেখ মুজিব কোনোভাবেই দুর্বল, অসহায় বা আত্মমর্যাদাহীন নেতা ছিলেন না। তিনি নিজের অবস্থান সম্পর্কে পুরোপুরি সজাগ, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন নেতা ছিলেন।
একটি বিতর্কিত দাবিও এখানে সততার সঙ্গে উল্লেখ করা দরকার। ১৯৭১ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর ভারতের দ্য অর্গানাইজার নামের একটি সাপ্তাহিকীতে দাবি করা হয়, ২৫শে মার্চের আগে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগরে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিনিময়ে বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনে সমর্থনের একটি প্রস্তাব দিয়েছিল; বঙ্গবন্ধু সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এই দাবিটা এখনো একটি মাত্র সাময়িকীর প্রতিবেদনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, স্বাধীন কোনো দলিল বা দ্বিতীয় তথ্যসূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাই দাবিটা একটি সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবেই থাকুক। যতক্ষণ পর্যন্ত আরও স্বাধীন তথ্য উৎসের খোঁজ পাওয়া না যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা না করাই সমীচীন।
১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯৭৪ সালের খাদ্যসাহায্য বিতর্ক পর্যন্ত পুরো সময়টা একসঙ্গে রাখলে একটি বিষয়ই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কখনো একটি নিরপেক্ষ, গুরুত্বহীন দেশ ছিল না। বরং বাংলাদেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক অস্বস্তির নাম, বড় কূটনৈতিক পরিকল্পনার প্রতিকূলে জন্ম নেওয়া একটি রাষ্ট্র, যার নেতৃত্বে ছিলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি।
পরের অধ্যায়ে দেখব, ১৯৭৫ সালে এই অস্বস্তি কীভাবে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের ভেতরের একটি দ্বন্দ্বে রূপ নিল। রাষ্ট্রদূত যা জানতেন, আর দূতাবাসের গোয়েন্দা কর্মকর্তা যা করছিলেন– এই দুইয়ের মধ্যে ফাঁক তৈরি হয়। সেই ফাঁকের অলিগলি ধরেই এই বইয়ের পরের অধ্যায় এগোবে।