← Bengal Prints বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডমাস্টারমাইন্ড থেকে ফুটসোলজার
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড — প্রচ্ছদ
একটি ভূ-রাজনৈতিক অনুসন্ধান

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড

মাস্টারমাইন্ড থেকে ফুটসোলজার

Bengal Prints · পাবলিক ডোমেইন (CC0 1.0) · © ২০২৬

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ডকে বাংলাদেশের একটি বিচ্ছিন্ন অভ্যন্তরীণ ঘটনা হিসেবে না দেখে লুমুম্বা ও আলেন্দের পাশে রাখা যায় কি না — ডিক্লাসিফাইড নথি, সিনেট কমিটির রিপোর্ট ও আন্তর্জাতিক গবেষণার আলোকে একটি প্যাটার্ন সাজিয়ে দেখানোর চেষ্টা। চূড়ান্ত রায় পাঠকের হাতে।

৮ অধ্যায়ভূমিকা · ৬ অধ্যায় · উপসংহার
তিন স্তরমাস্টারমাইন্ড · অপারেটিভ · ফুটসোলজার

সূচিপত্র

ভূমিকা
ভূমিকা

তিনটি নাম, একটি প্যাটার্ন

চার্চ কমিটি, লুমুম্বা-আলেন্দে ও এই বইয়ের কাঠামো
→
১
অধ্যায় ১

ত্রিভুজের ভেতর এক নতুন দেশ

বেইজিং বৈঠক, স্বীকৃতি ও ১৯৭৪-এর খাদ্য সাহায্য
→
২
অধ্যায় ২

এক মুঠোয় বাঁধা সুতো

চেরি-জিয়া নৈশভোজ ও রাষ্ট্রদূত বোস্টারের সন্দেহ
→
৩
অধ্যায় ৩

মাঝখানের মানুষেরা

সেনাবাহিনীর ভঙ্গুরতা, মোশতাক ও জিয়া
→
৪
অধ্যায় ৪

ভোরের আগে

বাকশাল, তরুণ মেজররা ও ১৫ই আগস্টের ভোর
→
৫
অধ্যায় ৫

পুরস্কার ও দায়মুক্তি

লিবিয়ার আশ্রয়, ইনডেমনিটি ও ফ্রিডম পার্টি
→
৬
অধ্যায় ৬

সাধারণ আদালতের অসাধারণ রায়

দুই দশকের বিচার, ফাঁসি ও পলাতকেরা
→
উপসংহার
উপসংহার

তিনটি নাম, একটি প্রশ্ন

লুমুম্বা, আলেন্দে ও বঙ্গবন্ধু — প্যাটার্ন ও পার্থক্য
→

এই সংস্করণ সম্পর্কে

এটি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড — মাস্টারমাইন্ড থেকে ফুটসোলজার বইয়ের একটি ওয়েব সংস্করণ। বইটি ডিক্লাসিফাইড নথি, সিনেট কমিটির রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক তদন্তকারী লেখকদের কাজ ও দেশীয় আইনি নথি একসঙ্গে পড়ে একটি প্যাটার্ন সাজিয়ে দেখায় — কোনো চূড়ান্ত রায় দেয় না।

কাঠামো

বইটি তিনটি স্তরে সাজানো — মাস্টারমাইন্ড (যারা দূর থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল), অপারেটিভ (যারা জানতেন বা অংশ ছিলেন), আর ফুটসোলজার (যারা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন)। চূড়ান্ত বিচারের ভার পাঠকের হাতে।

ভূমিকা

তিনটি নাম, একটি প্যাটার্ন

১৯৭৫ সালের ২৭শে জানুয়ারি। মার্কিন সিনেট একটি কমিটি গঠন করল, নাম– ‘সিলেক্ট কমিটি অন ইন্টেলিজেন্স অ্যাক্টিভিটিজ’। কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর ফ্র্যাঙ্ক চার্চ, সেই সূত্রে ইতিহাসে এই কমিটি পরিচিত হয়ে গেল ‘চার্চ কমিটি’ নামে। কমিটির কাজ ছিল একটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা: যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা কি বিদেশি নেতাদের সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল? দশ মাস তদন্তের পর, সেই বছরেরই ২০শে নভেম্বর কমিটি তাদের প্রথম রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, সিআইএ কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো আর কঙ্গোর প্যাট্রিস লুমুম্বাকে হত্যার সরাসরি পরিকল্পনা করেছিল, চিলির জেনারেল শ্নাইডারের হত্যাকারীদের সঙ্গেও তাদের যোগসূত্র ছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের নাম সেই রিপোর্টে নেই, থাকার কথাও না, কারণ কমিটির কাজের পরিধি নির্দিষ্ট কয়েকটা দেশ নিয়ে বাঁধা ছিল। বাংলাদেশ সেই কাজের আওতায় ছিল না।

বাংলাদেশ না থাকলেও এই বইয়ের শুরুতেই চার্চ কমিটির রিপোর্টের কথা বলছি কেন? কারণ সেই রিপোর্ট প্রকাশের মাত্র তিন মাস আগে, ১৫ই আগস্ট ভোরে, ঢাকার ধানমন্ডির এক বাড়িতে সশস্ত্র হামলা চালায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা ও সৈনিক; পুরুষ-নারী-শিশু নির্বিশেষে চালায় এক নির্মম হত্যাকাণ্ড। সেই বাড়িটি শেখ মুজিবের বাড়ি।

দু'টো ঘটনার মধ্যে কি কোনো সম্পর্ক আছে? এই বই সেই প্রশ্ন নিয়েই।

শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি, কিন্তু তাঁর পরিচয় শুধু একটি দেশের সীমানায় আটকে ছিল না। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি একদল নেতার উত্থান হয়েছিল, যাঁরা শীতল যুদ্ধের দ্বন্দ্বমুখর সময়ে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী ব্লক কিংবা সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট ব্লকের বাইরে নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তা নিয়ে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। নাসের, নেহরু, সুকর্ণ, নক্রুমা, লুমুম্বা, আলেন্দে– প্রত্যেকের দেশ ছিল ছোট বা দরিদ্র। কিন্তু প্রতিটি নেতা বিশ্বরাজনীতিতে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিলেন নিজ নিজ আদর্শ ও ব্যক্তিত্বের জোরে। শেখ মুজিবুর রহমান সেই সারিরই একজন নেতা। তাঁর রাজনীতিতে সমাজতান্ত্রিক ঝোঁক ছিল স্পষ্ট, কিন্তু তা মস্কোর নির্দেশে পরিচালিত কোনো রাজনীতি ছিল না– এটি ছিল তাঁর নিজের পথ।

ঠিক এই কারণেই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এই সারির আরও দুজন নেতা, লুমুম্বা ও আলেন্দে, দু'জনেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন এবং দু'টি ঘটনাতেই বাইরের একটি শক্তির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। শেখ মুজিবের বেলায়ও সেই একই ধারা খুঁজে দেখা উচিত নয় কি?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি কথা পরিষ্কার করে রাখি। এই বই কোনো চূড়ান্ত রায় দিতে বসেনি। ১৯৭৫ সালের ঘটনার পেছনে কোনো একটি নির্দিষ্ট নির্দেশনামা এখনো কারো হাতে নেই। যা হাতে আছে, তা হলো একই প্রকৃতির ঘটনা বিন্যাস। কিছু সন্দেহজনক সাক্ষাৎ, কিছু অবমুক্ত তারবার্তা, একজন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রদূতের নিজের সন্দেহ আর সেই বৈশ্বিক রাজনীতি– যেখানে বাংলাদেশের জন্ম একটি পরাশক্তির জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সার বেঁধে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো পাঠকের সামনে মেলে ধরাই এই বইয়ের কাজ। এরপর পাঠক নিজেই বিচার করবেন, অন্যান্য বিশ্বনেতার হত্যাকাণ্ডের সাথে মুজিব হত্যাকাণ্ডের ধারা প্রকৃতির মিল কতটা জোরালো।

পাঠকের বিচারের সুবিধার্থে বইটিতে তিন স্তরের একটি কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে। সবচেয়ে উপরে থাকবেন মাস্টারমাইন্ড, যাদের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল; অর্থাৎ যারা দূর থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মাঝখানে থাকবেন অপারেটিভ, যারা কী ঘটতে যাচ্ছে তা জানতেন– পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন। আর সবচেয়ে নিচে থাকবেন ফুটসোলজার, যারা ব্যক্তিগত ক্ষোভে অস্ত্র হাতে তুলেছিলেন– প্রায় না জেনেই অনেক বড় এক দাবার ছকের গুটিতে পরিণত হয়েছিলেন। মাস্টারমাইন্ড, অপারেটিভ ও ফুটসোলজার– এই তিন স্তর ধরেই বইটি এগোবে।

ভূমিকা শেষ করার আগে আরেকটি কথা। বাংলাদেশে শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ড নিয়ে লেখার অভাব নেই। কিন্তু বেশিরভাগ লেখাই হয় আবেগে ভেসে যায়, নয়তো রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মিলিয়ে লেখা হয়। এই বই এক ভিন্ন পথ নিতে চায়। অবমুক্ত নথি, সিনেট কমিটির প্রতিবেদন, আন্তর্জাতিক তদন্তকারী লেখকদের কাজ এবং দেশীয় আইনি নথি– সব একসঙ্গে পড়ে একটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রচেষ্টা। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড কি সত্যিই সেই তালিকায় পড়ে, যে তালিকায় লুমুম্বা ও আলেন্দে আছেন?

উত্তর পাঠকের হাতে। আমাদের কাজ শুধু তথ্য সাজিয়ে দেওয়া।

অধ্যায় ১

ত্রিভুজের ভেতর এক নতুন দেশ

১৯৭১ সালের ৮ই জুলাই, ভরদুপুর। হেনরি কিসিঞ্জার ইসলামাবাদে নামলেন। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি কিসিঞ্জারের এশিয়া সফরের একটি পর্ব, সায়গন থেকে ব্যাংকক হয়ে দিল্লি ঘুরে পাকিস্তান, কিন্তু তলে তলে অন্য কিছুর পরিকল্পনা চলছিল। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে নব্বই মিনিটের বৈঠকের পর কিসিঞ্জার হঠাৎ 'অসুস্থ' বোধ করা শুরু করলেন। সেই অসুস্থতার ছলে তাঁর সফরসূচি বদলে ফেললেন। বলা হলো, কিসিঞ্জার বিশ্রামের জন্য পাহাড়ি শহর নাথিয়াগালিতে যাচ্ছেন। বাস্তবে তিনি রাতের অন্ধকারে চাকলালা বিমানবন্দর থেকে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে রওনা দিলেন বেইজিংয়ের পথে। ৯ থেকে ১১ জুলাই, এই তিনদিন কিসিঞ্জার চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইয়ের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করলেন।

এই গোপন বৈঠক বিংশ শতাব্দীর কূটনীতির ইতিহাসে অন্যতম বড় ঘটনা হিসেবে জায়গা করে নেয়, এখান থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দুই দশকের বৈরিতা ভাঙার পথ খুলে। কিসিঞ্জার-চৌ এন লাইয়ের গোপন বৈঠক এই বইয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অন্য কারণে। তিনদিনের ঐ আলোচনায় দক্ষিণ এশিয়ার একটি সংকট নিয়েও কথা হয়েছিল। সেই সংকটের কেন্দ্রে ছিল একাত্তরের বাংলাদেশ, যেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে একটি মুক্তিযুদ্ধ চলছে, মুজিব বন্দী পাকিস্তানের কারাগারে। এই বৈঠকের সূত্র ধরে এগুলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের জন্মের প্রশ্নটা কেন শুরু থেকেই একটি আঞ্চলিক ঘটনার চেয়ে অনেক বড় কিছু ছিল।

পুরো ঘটনাপ্রবাহ ভালোভাবে বুঝতে চলুন আরও কয়েক বছর পেছনে ফিরে যাই। ১৯৬২ সাল, যখন ভারত ও চীনের মধ্যে একটি সীমান্তযুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধের পর দুই দেশের সম্পর্ক বহু বছরের জন্য শীতল হয়ে যায়, যার জের ধরে পরবর্তী এক দশকে একটি নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়– চীন ভারতকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শুরু করে। অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের পুরনো বৈরিতার কারণে চীনের কাছে পাকিস্তান পরম মিত্র হয়ে ওঠে। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে এই মিত্রতার প্রথম বড় প্রমাণ দেখা যায়, সেই সময় চীন সিঙ্কিয়াং সীমান্তে সেনা সমাবেশ করে ভারতের ওপর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করে।

চীন-পাকিস্তানের পুরনো মিত্রতার প্রেক্ষাপটেই ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ সংকট শুরু হয়। মার্চ মাসে পাকিস্তান যখন বাংলাদেশে সামরিক আগ্রাসন শুরু করে, চীন প্রথম থেকেই পাকিস্তানের পাশে দাঁড়ায়। ২৩শে মার্চ, পাকিস্তানের জাতীয় দিবসে, চৌ এন লাই ইয়াহিয়া খানকে পাঠানো অভিনন্দন বার্তায় পাকিস্তানের জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ে চীনের অবিচল সমর্থনের কথা ব্যক্ত করেন। এপ্রিলের মাঝামাঝি এই অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চৌ এন লাইয়ের একটি চিঠি ইয়াহিয়া খানের কাছে পৌঁছায়। সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের সংকটকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে অভিহিত করা হয় এবং একই সাথে, ভারতকে সেই অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানানো হয়। করাচির সংবাদপত্রে সেই চিঠি ছাপা হয়েছিল একাত্তরের এপ্রিলেই।

চীন ও পাকিস্তানের এই ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজের একটি বড় পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছিলো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের মাধ্যমে। ১৯৬৯ সাল থেকেই ইয়াহিয়া ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের একটি গোপন চ্যানেল হিসেবে কাজ করছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাকিস্তান তখন নিছক মিত্র দেশ না; বরং চীনের দরজা খোলার চাবিকাঠি। ষাটের দশকের শেষে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে। দুই কমিউনিস্ট শক্তির মধ্যে রেষারেষিতে সীমান্ত সংঘর্ষও হয়েছিল। নিক্সন ও কিসিঞ্জার এই ফাটলকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সুবিধায় কাজে লাগাতে চাইলেন। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে সোভিয়েত ইউনিয়নকে চাপে রাখা যাবে, আর একটি সাংঘর্ষিক ত্রিভুজের মধ্যে ওয়াশিংটন সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। কিন্তু এই ত্রিভুজ দাঁড়িয়ে ছিল একটি চতুর্থ স্তম্ভের ওপর– পাকিস্তান। আর পাকিস্তান নামক সেই স্তম্ভের শক্তি নির্ভর করছিল তার ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর। এই বাস্তবতা মাথায় নিয়ে চলুন আবারও ফিরে যাই কিসিঞ্জারের ইসলামাবাদ হয়ে বেইজিংয়ের সেই গোপন সফরে।

১০ই জুলাই, ১৯৭১। কিসিঞ্জার ও চৌ এন লাইয়ের বেইজিং বৈঠকের দ্বিতীয় দিনে দক্ষিণ এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। দুজনেই মনে করতেন, বাংলাদেশের প্রতিরোধের পেছনে ভারতের হাত আছে এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ইয়াহিয়া সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে দিচ্ছে। চৌ এন লাই স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘ভারত যদি নিজের পথে চলতে থাকে, তাহলে চীন পাকিস্তানের পাশে দাঁড়াবে।’ এই কথোপকথন পরবর্তীতে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঐতিহাসিক নথিপত্রের সংকলনে প্রকাশিত হয়। এই একটি বৈঠকের নথিই দেখিয়ে দেয়, বাংলাদেশের জন্মের প্রশ্নটি কেন শুধু দক্ষিণ এশিয়ার একটি আঞ্চলিক ঘটনা ছিল না। ওয়াশিংটন ও বেইজিং যখন একে অপরের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছিল, ঠিক তখনই তাদের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম পাকিস্তান নিজের অস্তিত্ব-সংকটে খাবি খাচ্ছিল। পাকিস্তান ভেঙে গেলে শুধু একটি মিত্র দেশই দুর্বল হয়ে পড়ত না; নতুন করে গড়ে ওঠা এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভও ভেঙে পড়ত। নিক্সন প্রশাসন তাই বাংলাদেশ সংকটে পাকিস্তানের পক্ষেই ঝুঁকে ছিল।

নিক্সনের এই নীতির বিরুদ্ধে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই প্রবল প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ঢাকার মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড আর তাঁর সহকর্মীরা এপ্রিল মাসে ওয়াশিংটনে একটি প্রতিবাদী তারবার্তা পাঠান, যা কি না পরবর্তীতে ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে পরিচিতি পায়। ব্লাড টেলিগ্রামে আর্চার নিক্সন প্রশাসনের কৌশলগত নীরবতাকে ‘নৈতিক ব্যর্থতা’ বলে অভিহিত করেন। সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি-ও একাত্তরের আগস্টে ভারতের শরণার্থী শিবির সরেজমিনে পরিদর্শন করে পাকিস্তানে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবি তোলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত হয় ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’, যেখানে সাধারণ মার্কিন নাগরিকেরা বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ান। ওদিকে সকল জনমত অগ্রাহ্য করে, ডিসেম্বরে যুদ্ধের একেবারে শেষ পর্যায়ে, পাকিস্তান সমর্থনের প্রতীকী প্রদর্শন হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার পারমাণবিক শক্তিচালিত রণতরী ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ বঙ্গোপসাগরে পাঠায়। অর্থাৎ, নিক্সন-কিসিঞ্জারের নীতি সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রের একরৈখিক অবস্থান ছিল না। প্রশাসনের ভেতরে যেমন মতভেদ ছিল, তেমনি মার্কিন সমাজেও বাংলাদেশ প্রশ্নে তীব্র বিভাজন দেখা দিয়েছিল। কিসিঞ্জারের সিদ্ধান্ত পুরো যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং ক্ষমতার কেন্দ্রের একটি সংকীর্ণ বৃত্তের সিদ্ধান্ত ছিল। পরবর্তী অধ্যায়গুলোর বিশ্লেষণ বুঝতে এই পার্থক্যটি মনে রাখা জরুরি।

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান লজ্জাজনকভাবে পরাজিত হলো। বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। কিসিঞ্জারের কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশে এটি ছিল একটি বড় পরাজয়। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রধান যে দেশটিকে অখণ্ড রাখতে চেয়েছিলেন, সেটি ভেঙে গেল। আবার, ভারত নামের যে শক্তি এই ভাঙনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল, সেই ভারত যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল।

সেই বৈশ্বিক বাস্তবতায়, ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ফিরলেন। যুক্তরাষ্ট্র তখনো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। তাই ঢাকায় তাদের পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস ছিল না; ছিল শুধু একটি কনস্যুলেট জেনারেল, যার প্রধান ছিলেন হার্বার্ট স্পিভাক। ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রদূত ছিলেন, কিন্তু বাংলাদেশে ছিলেন না। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান তখনো কতটা অনিশ্চিত ছিল!

ফেব্রুয়ারির শেষে বঙ্গবন্ধু সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরের সিদ্ধান্ত নিলেন। সোভিয়েত যাত্রার আগে, ২৬শে ফেব্রুয়ারি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ স্পিভাকের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি জানান, মস্কো যাওয়ার আগে বাংলাদেশ সরকার ‘স্বীকৃতি’র প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান জানতে চায়। ঢাকায় মার্কিন কনস্যুলেটের ভবিষ্যৎও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরের ওপর নির্ভর করছে। সামাদ আরও জানান, মস্কোর সঙ্গে যে ধরনের সম্পর্ক গড়ে উঠবে, তা ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব চান না, আরেকটি পরাশক্তির অবস্থান সম্পর্কে কোনো অস্পষ্টতা রেখেই সেই নতুন সম্পর্ক গড়ে উঠুক।

স্পিভাক এই বার্তা জরুরি ভিত্তিতে ওয়াশিংটনে পাঠান। মস্কো সফরের আগে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একটি বিস্তারিত আলোচনার অনুমতিও চান তিনি। বার্তাটি হোয়াইট হাউসে কিসিঞ্জারের দপ্তরে পৌঁছায়। তবে আলোচনার অনুমতি দেওয়া হলো না, আর স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতির প্রশ্নেও কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলো না। সে সময় প্রেসিডেন্ট নিক্সন চীন সফরে ছিলেন। ওয়াশিংটন জানায়, স্বীকৃতির প্রশ্নটি নিক্সনের সফর শেষে বিবেচনা করা হবে। ওয়াশিংটনের এই কালক্ষেপণের মধ্যেই, মুজিব মস্কো রওনা দিলেন ২৯শে ফেব্রুয়ারি।

মার্চের শুরুতে স্পিভাক নিজেই ওয়াশিংটনকে লিখলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের ধৈর্যের সীমা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। স্বীকৃতি ছাড়া এই কনস্যুলেট চালানো ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠছে।’ তখন স্পিভাককে সাময়িকভাবে ওয়াশিংটনে ডেকে আনার প্রস্তাব দিলেন ওয়াশিংটনের এক কর্মকর্তা। উদ্দেশ্য ছিল মার্চের শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়া, যাতে বাংলাদেশের কাছে এমন কোনো বার্তা না পৌঁছায় যে তাদের চাপেই যুক্তরাষ্ট্র স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় ১৯৭২ এর ৪ঠা এপ্রিল।

এই ঘটনাক্রম থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর মস্কো সফর নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য সফর ছিল না; এটি ছিল কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের একটি হাতিয়ার। ওয়াশিংটন সেই চাপ ঠিকই অনুভব করেছিল। তবে একটি কথা বলে রাখা দরকার। মূল নথিতে ‘সোভিয়েত ব্লকে চলে যাওয়া’– এই শব্দবন্ধ হুবহু নেই; বরং আছে বাংলাদেশ-সোভিয়েত দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের একটি নতুন ধারা গড়ে ওঠার আশঙ্কা। তবে অর্থ প্রায় একই।

বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক চাপে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি না হয় মিললো। কিন্তু আস্থার সম্পর্ক কি তৈরি হলো? রাষ্ট্র পরিচালনায় শেখ মুজিবের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি ঝোঁক, ভারত-সোভিয়েত ঘনিষ্ঠতা ইত্যাদি সবকিছু মিলিয়ে ওয়াশিংটনে, বিশেষ করে কিসিঞ্জারের মনে, মুজিবের প্রতি এক ধরনের অস্বস্তি থেকেই গেল।

স্বাধীনতার পরপর, বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের ২৯শে মার্চ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এগারোশো’র বেশি পাকিস্তানি সেনাসদস্যের বিচারের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। বি. জেড. খসরু তাঁর বইয়ে দাবি করেন, পাকিস্তানি সেনাদের বিচার বাংলাদেশের মাটিতে না করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ব্যবহার করে নব্যস্বাধীন বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। ১৯৭৪ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়। সেই চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দির বিচার থেকে সরে আসতে সম্মত হয়; বিনিময়ে পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের এই চাপের পেছনে ছিল তাদের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ। বাংলাদেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্পন্ন হলে পাকিস্তানে তীব্র জনরোষ সৃষ্টি হয়ে ভুট্টো সরকারের পতন ঘটতে পারে– ওয়াশিংটনের আশঙ্কা ছিল এমনই। সেই সময় ভুট্টো সরকারের পতন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী ছিল। তাই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র পাকিস্তানের স্থিতিশীলতা রক্ষার স্বার্থে বাংলাদেশকে নিজের ন্যায়বিচারের দাবি থেকে সরে আসতে হয়। এটি ছিল বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের ওপর ওয়াশিংটনের চাপের আরেকটি উদাহরণ, ১৯৭৪ সালের খাদ্য সাহায্য বিতর্কেরও আগে।

বাংলাদেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক ছক প্রসঙ্গে ১৯৭১ সালের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের কথাও উল্লেখ করা দরকার। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনীর স্থানীয় সহযোগী ‘জামায়াতে ইসলামী’ তাদের তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতাকর্মীদের নিয়ে ‘আলবদর বাহিনী’ গঠন করে। কুখ্যাত এই বাহিনী যুদ্ধের শেষদিকে তালিকা ধরে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও লেখকদের তুলে নিয়ে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর নাম উঠে আসে। যুদ্ধ শেষে উদ্ধার হওয়া রাও ফরমানের ব্যক্তিগত ডায়েরিতে বহু বুদ্ধিজীবীর নাম পাওয়া যায়। সেই একই ডায়েরিতে দুজন মার্কিন নাগরিকের নামও ছিলঃ হেইট ও ডুসপিক। নামের পাশে লেখা ছিল ‘ইউএসএ’ এবং ‘ডিজিআইএস’। হেইট ১৯৫৩ সাল থেকে মার্কিন সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীতে যুক্ত ছিলেন, আর ডুসপিক ছিলেন সিআইএ’র এজেন্ট। ষাটের দশকে ইন্দোনেশিয়ায় গণহত্যার প্রসঙ্গেও তাদের দুজনের নাম উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে অবমুক্ত নথি থেকে সেই গণহত্যায় সিআইএর সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে জানা যায়। যদিও এই তথ্য থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে– সিআইএ সরাসরি বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দিয়েছিল। তবে এটি অন্তত ইঙ্গিত দেয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তগুলোতেও মার্কিন গোয়েন্দা বলয়ের একটি উপস্থিতি ছিল। আর ইসলামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনকে হত্যার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পরিচিত কৌশল বাংলাদেশে দেখা গিয়েছিল ১৯৭১ সালেই; ১৯৭৫ সালের চার বছর আগে।

তবে বাংলাদেশকে নিয়ে মার্কিন সরকারের অস্বস্তির সবচেয়ে নিষ্ঠুর বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৭৪ সালে। সে বছর বন্যায় বাংলাদেশে খাদ্যসংকট তীব্র হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের পিএল-৪৮০ খাদ্যসহায়তা কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশের গম পাওয়ার কথা ছিল। বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন সে বছর কিউবার কাছে ৫০ লক্ষ ডলারের পাটের বস্তা বিক্রি করে। কিউবার সাথে এটি বাংলাদেশের এককালীন লেনদেন ছিল, কোনো স্থায়ী বাণিজ্যিক সম্পর্ক নয়। পিএল-৪৮০ কর্মসূচির নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ কিউবার মতো কালো তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য করলে খাদ্যসহায়তা বন্ধ রাখা হবে। ১৯৭৪ সালের ২৭শে মে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ সরকারকে এই শর্তের কথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন। এরপর বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত খাদ্যসহায়তা স্থগিত হয়ে যায়।

তবে অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান পরে এই ঘটনাকে নিছক নিয়মের কড়াকড়ি হিসেবে দেখেননি। তাঁর মতে, এটি ছিল বাংলাদেশ সরকারের উপর সরাসরি চাপ, সরকারের টিকে থাকার সক্ষমতার উপর আঘাত। খাদ্যাভাবে দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে মরিয়া বাংলাদেশ সরকার কিউবার সঙ্গে ভবিষ্যতে আর কোনো বাণিজ্য না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তারপরও খাদ্যসহায়তার চুক্তি সই হতে প্রায় এক বছর সময় লেগে যায়। ততোদিনে দুর্ভিক্ষের সবচেয়ে ভয়াবহ সময় পেরিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্যসহায়তায় কালবিলম্বই যে দুর্ভিক্ষের একমাত্র কারণ, তা না। দেশের ভেতরের মজুতদারি আর বণ্টনব্যবস্থার ব্যর্থতাও চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী। কিন্তু ঠিক সংকটের মুহূর্তে বহিঃশক্তির চাপ একটি বার্তাই স্পষ্ট করে– বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি ওয়াশিংটনের পছন্দমতো না চললে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণকে তার মূল্য দিতে হবে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র যে পুরোপুরি বৈরী ছিল না– এটাও মনে রাখা দরকার। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠন কর্মসূচিতে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত UNROD (UN Relief Operations Dhaka) এ যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় দাতা দেশগুলোর একটি হয়ে ওঠে। ১৯৭২ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রাপ্ত ৭৯৭ মিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক সাহায্যের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একাই দেয় ২৬৩ মিলিয়ন ডলার; অর্থাৎ মোট সাহায্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ১৯৭৩ সালে ভারতকেও ছাড়িয়ে সবচেয়ে বড় দাতা হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র; তাদের মোট সাহায্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩১৮ মিলিয়ন ডলার। বলাবাহুল্য, এই উদারতার পেছনে নিছক মানবিকতা ছিল না। স্নায়ুযুদ্ধের যুগে যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল সদ্য স্বাধীন দেশ বাংলাদেশ যেন সোভিয়েত শিবিরে পুরোপুরি ঢুকে না পড়ে। বাংলাদেশ সোভিয়েত শিবিরে ঢোকেনি, কিন্তু পশ্চিমা শিবিরেও পুরোপুরি ঢোকেনি। এই সম্পূর্ণ নতজানু না হওয়াটাই সম্ভবত ওয়াশিংটনকে ক্ষুব্ধ করেছিল। একদিকে সাহায্য দিয়ে কাছে টানার প্রয়াস, আবার অন্যদিকে সাহায্য আটকে রেখে শাস্তি দেওয়া– যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল বাস্তবায়নের একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

বঙ্গবন্ধু নিজে একাধিকবার এই টানাপোড়েনের কথা প্রকাশ্যে বলেছেন। ১৯৭২ সালের ৩১শে জানুয়ারি, ঢাকা স্টেডিয়ামে মুজিব বাহিনীর অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানে, বঙ্গবন্ধু মার্কিন জনগণ, সাংবাদিক আর সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডির মতো নেতাদের ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি নিক্সন প্রশাসনের সমালোচনাও করেন। কারণ, গণহত্যার খবর জানা সত্ত্বেও নিক্সন প্রশাসন পাকিস্তানকে একাত্তরে অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে। ১৯৭৪ সালের ৪ঠা মার্চ, কুমিল্লা সেনানিবাসে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির প্রথম ব্যাচের কুচকাওয়াজে দেওয়া ভাষণে, বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে পরাশক্তিগুলোর দৃষ্টি এড়াতে পারে না। বাংলাদেশ কার্যত আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি উত্তপ্ত আসনে বসে আছে।’ সেই বছরেরই ২৫শে সেপ্টেম্বর, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া আরেক ভাষণে, শেখ মুজিব এই কথাগুলো আরও বিস্তৃতভাবে বলেন। সেই ভাষণে মুজিব জোটনিরপেক্ষতা আর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি ঘোষণা করেন। ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরকে শান্তির এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যাতে এই অঞ্চল পরাশক্তিদের সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে না ওঠে। তাঁর এসব বক্তব্যের মূল সুর ছিল একটিই– বাংলাদেশ সব দেশের সহযোগিতা নিতে প্রস্তুত, সহযোগিতা তার দরকারও; কিন্তু সেই সহযোগিতা যেন নিজের সার্বভৌমত্ব বা আত্মমর্যাদা বিকিয়ে দিয়ে না হয়। একটি ক্ষুদ্র, দরিদ্র ও সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের নেতা হয়েও মুজিব নিজের দেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে যে স্তরের সচেতনতা দেখিয়েছিলেন, সেটিই সম্ভবত তাঁকে ওয়াশিংটনের কাছে আরও অস্বস্তিকর করে তুলেছিল। কারণ শেখ মুজিব কোনোভাবেই দুর্বল, অসহায় বা আত্মমর্যাদাহীন নেতা ছিলেন না। তিনি নিজের অবস্থান সম্পর্কে পুরোপুরি সজাগ, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন নেতা ছিলেন।

একটি বিতর্কিত দাবিও এখানে সততার সঙ্গে উল্লেখ করা দরকার। ১৯৭১ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর ভারতের দ্য অর্গানাইজার নামের একটি সাপ্তাহিকীতে দাবি করা হয়, ২৫শে মার্চের আগে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগরে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিনিময়ে বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনে সমর্থনের একটি প্রস্তাব দিয়েছিল; বঙ্গবন্ধু সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এই দাবিটা এখনো একটি মাত্র সাময়িকীর প্রতিবেদনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, স্বাধীন কোনো দলিল বা দ্বিতীয় তথ্যসূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাই দাবিটা একটি সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবেই থাকুক। যতক্ষণ পর্যন্ত আরও স্বাধীন তথ্য উৎসের খোঁজ পাওয়া না যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা না করাই সমীচীন।

১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯৭৪ সালের খাদ্যসাহায্য বিতর্ক পর্যন্ত পুরো সময়টা একসঙ্গে রাখলে একটি বিষয়ই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কখনো একটি নিরপেক্ষ, গুরুত্বহীন দেশ ছিল না। বরং বাংলাদেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক অস্বস্তির নাম, বড় কূটনৈতিক পরিকল্পনার প্রতিকূলে জন্ম নেওয়া একটি রাষ্ট্র, যার নেতৃত্বে ছিলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি।

পরের অধ্যায়ে দেখব, ১৯৭৫ সালে এই অস্বস্তি কীভাবে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের ভেতরের একটি দ্বন্দ্বে রূপ নিল। রাষ্ট্রদূত যা জানতেন, আর দূতাবাসের গোয়েন্দা কর্মকর্তা যা করছিলেন– এই দুইয়ের মধ্যে ফাঁক তৈরি হয়। সেই ফাঁকের অলিগলি ধরেই এই বইয়ের পরের অধ্যায় এগোবে।

অধ্যায় ২

এক মুঠোয় বাঁধা সুতো

১৯৭৫ সাল, আগস্টের প্রথম সপ্তাহ। ঢাকার এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে নৈশভোজের আয়োজন। অতিথি তালিকায় দু'টো নাম বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একজন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান। আরেকজন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার স্টেশন চিফ ফিলিপ চেরি। খাবার টেবিলে বসে দু'জনে কথা বললেন। বিস্তারিত কী আলোচনা হয়েছিল তার পূর্ণ বিবরণ আজও পাওয়া যায় না। কিন্তু বৈঠকের সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। বৈঠক হয়েছিল ১৫ই আগস্টের মাত্র সাত থেকে দশ দিন আগে।

এই বৈঠকের গুরুত্ব বুঝতে হলে কয়েক মাস পেছনে ফিরে যেতে হবে। ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজিন বোস্টার দূতাবাসের সব কর্মকর্তাকে একটি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন: মুজিব সরকারকে উৎখাত করার চেষ্টায় জড়িত যে কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে। এই নির্দেশ নিছক সতর্কতা ছিল না; এর পেছনে একটি বাস্তব উদ্বেগ ছিল। ১৯৭৪ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দূতাবাসের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে মার্কিন সমর্থনপ্রত্যাশী কয়েকজন ব্যক্তির বৈঠক হয়েছিল। বোস্টার এই ধরনের যোগাযোগ একেবারেই চাননি।

কিন্তু আগস্টের প্রথম সপ্তাহের সেই নৈশভোজ প্রমাণ করে, বোস্টারের নির্দেশ তাঁর নিজের দূতাবাসের ভেতরেই লঙ্ঘিত হচ্ছিল। ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ-এর দক্ষিণ এশিয়া সংবাদদাতা লরেন্স লিফশুলজের লেখায়ও এই বিষয়টি উঠে এসেছে: বোস্টার নিজেই একটি সময় বুঝতে পারেন যে তাঁর দূতাবাসের সিআইএ স্টেশন তাঁর অজান্তে একটি আলাদা চ্যানেলে কাজ করছে। এই সন্দেহ তাঁর মনে গভীর অস্বস্তি তৈরি করেছিল।

লেখক ক্রিস্টোফার হিচেন্স তাঁর ‘দ্য ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার’ বইয়ে এই ঘটনার একটি ব্যাখ্যা দেন। তাঁর মতে, নিক্সনের পদত্যাগের বছরখানেক পর, ১৯৭৫ সালের আগস্টে ওয়াশিংটনে একটি-ই কেন্দ্র ছিল যেখান থেকে পর্দার আড়ালে এই ধরনের গোপন তৎপরতা অনুমোদন পেতে পারত। ফরটি কমিটি (Forty Committee) আর জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সুতোগুলো শক্ত করে এক মুঠোয় ধরে রেখেছিলেন তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। উল্লেখ্য, শীতল যুদ্ধের সময়কার ফরটি কমিটি হচ্ছে হোয়াইট হাউসের অধীনে একটি অত্যন্ত গোপনীয় নীতিনির্ধারণী কমিটি, যার মূল কাজ ছিল বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন রাজনৈতিক কার্যক্রম অনুমোদন ও পর্যালোচনা করা।

ব্যাখ্যাটি জোরালো হলেও সততার প্রশ্ন থেকেই যায়। সাংবাদিক লিফশুলজ এই বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার স্টেশন চিফ ফিলিপ চেরি কার নির্দেশে কাজ করছিলেন– ফরটি কমিটির অনুমোদনে, নাকি সরাসরি কিসিঞ্জারের দপ্তরের নির্দেশে– সে প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা; আরও অনুসন্ধান দরকার। জিয়াউর রহমান মার্কিন সমর্থন ছাড়া এগোতেন কি না– সেই বিষয়টিও বিশদ তদন্তের দাবিদার বলে উল্লেখ করেন লিফশুলজ।

এই সতর্কতার বিপরীতে আরেকটা গবেষণা দাঁড়িয়ে আছে। সাংবাদিক বি. জেড. খসরু তাঁর বই ‘দ্য বাংলাদেশ মিলিটারি ক্যু অ্যান্ড দ্য সিআইএ লিংক’-এ মার্কিন জাতীয় আর্কাইভের বহু অপ্রকাশিত নথি ঘেঁটে ভিন্ন এক উপসংহারে পৌঁছান। তাঁর মতে, এই অভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ভেতরেই জন্ম নেওয়া একটি পরিকল্পনা। আট মাস ধরে চলা একটি ষড়যন্ত্র, যার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র আগাম জানত, কিন্তু সরাসরি পরিচালনায় যুক্ত ছিল না। খসরুর ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও স্বীকার করেছিল যে, অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে তাদের কাছে কিছু অস্পষ্ট তথ্য ছিল। যদিও তৎকালীন ভারতীয় হাইকমিশনার সমর সেন পরে দাবি করেন, ঢাকায় তাদের নিজস্ব কোনো গোয়েন্দা সূত্র ছিল না।

দুটি ভিন্ন গবেষণা, দুটি ভিন্ন উপসংহার। লিফশুলজ ও হিচেন্স সরাসরি ওয়াশিংটনের সংশ্লিষ্টতার দিকে ইঙ্গিত করেন। অন্যদিকে খসরুর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল জানার স্তরে, নিয়ন্ত্রণের স্তরে নয়। এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়। বোস্টারের নির্দেশ, তাঁর অস্বস্তি, আর এর বিপরীতে তাঁর নিজের দূতাবাসের ভেতরে চলতে থাকা সমান্তরাল যোগাযোগ– এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা না করলে বোঝা কঠিন, কেন একজন রাষ্ট্রদূত নিজের স্টেশন চিফের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে এতটা অন্ধকারে ছিলেন।

পরে বোস্টারের অস্বস্তির আরও প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৯৭৫ সালের ৮ই মে তিনি ওয়াশিংটনে একটি তারবার্তা পাঠান। সেখানে বোস্টার লেখেন, ঢাকায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রকাশ্য বক্তব্য ক্রমেই বাড়ছে; এ নিয়ে তিনি বাংলাদেশের এক মন্ত্রীর সঙ্গেও সরাসরি কথা বলেছেন। অর্থাৎ, সে সময় দূতাবাসের ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছিল। রাজনৈতিক পরিবেশও ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। আর রাষ্ট্রদূত নিজে সেই উত্তাপ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন।

তারপর এলো ১৫ই আগস্ট। ভোর সাড়ে পাঁচটার কিছু আগে ধানমন্ডিতে বিস্ফোরণের শব্দ। মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা যখন চ্যান্সারির দিকে রওনা দিলেন, রাস্তায় তাঁরা ভারী ট্যাংক বহরের মুখোমুখি হলেন। দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে পাঠানো প্রথম তারবার্তায় লেখা হলো: মুজিবের বাড়ির আশপাশে বিস্ফোরণ হয়েছে। তাঁর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনির বাড়িতে ভারী গোলাগুলি হয়েছে। প্রতিবেশীরা বলছেন, তিনি নিহত। তারবার্তার শেষে একটিই স্বাক্ষর– প্রেরকের নাম, বোস্টার।

পরদিন ১৬ই আগস্ট, বোস্টার আরেকটা দীর্ঘ তারবার্তায় পাঠালেন অভ্যুত্থানের প্রাথমিক বিশ্লেষণ। তিনি লিখলেন– সেনাবাহিনী, রক্ষী বাহিনী, পুলিশ প্রধান, সবাই নতুন সরকারের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিয়েছে। তাই এই অভ্যুত্থান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে না। তারবার্তায় তিনি আরও লিখলেন– বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চে এখন এমন কোনো নেতা নেই, যাঁর ব্যক্তিত্বে সেই শক্তি আছে, যা শেখ মুজিবকে এতদিন ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছিল। এই পর্যবেক্ষণ একজন রাষ্ট্রদূতের ঠান্ডা মাথার বিশ্লেষণ, কোনো ষড়যন্ত্রের স্বীকারোক্তি নয়। কিন্তু এই তারবার্তা এটুকু নিশ্চিত করে যে বোস্টার নিজে ঘটনার কেন্দ্রে থেকে প্রতি মুহূর্তের হিসেব রাখছিলেন। অথচ পর্দার আড়ালের যে তৎপরতা নিয়ে তিনি আগে উদ্বিগ্ন ছিলেন, তার কোনো উল্লেখই নেই এই তারবার্তায়।

এই নীরবতাও একটি তথ্য। একজন রাষ্ট্রদূত যদি সত্যিই বিশ্বাস করেন, তাঁর নিজের দূতাবাসের একটি অংশ তাঁকে না জানিয়ে কাজ করেছে, আর তারপরই ঘটে সেই ঘটনা, যার আভাস তিনি আগেই পেয়েছিলেন, তাহলে সরকারি তারবার্তায় সেই সন্দেহের কোনো চিহ্ন না থাকাটাই স্বাভাবিক। কূটনৈতিক ভাষায় এমন সন্দেহ প্রকাশের সুযোগ সীমিত, বিশেষ করে নিজের সংস্থার আরেকটি শাখা সম্পর্কে। তাই বোস্টারের সন্দেহের ইঙ্গিত খুঁজে পাওয়া যায় পরে– তাঁর ব্যক্তিগত কথোপকথনে, সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে; সরকারি নথিতে নয়।

এই অধ্যায়ের শেষে একটি কথা স্পষ্ট করে বলা দরকার। ফিলিপ চেরি আর জিয়াউর রহমানের মধ্যকার নৈশভোজের বৈঠক একাধিক স্বাধীন সূত্রে নিশ্চিত। বোস্টারের নিজের নির্দেশ এবং পরবর্তী সন্দেহের কথাও দলিলভিত্তিক। কিন্তু এই বৈঠকের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সরাসরি নির্দেশনার একটি রৈখিক সংযোগ এখনো নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই বই সেই রেখা টেনে দেওয়ার দাবি করে না। এই বই শুধু এটুকু দেখাতে চায়, কেন সেই রেখা টানার প্রশ্নটি আজও জীবিত। কেন এটি নিছক কোন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়, বরং আরও গভীর অনুসন্ধানের দাবি রাখে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেতরে কী ধরনের বিভাজন ও প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতা এই সুযোগ তৈরি করেছিল, সেই সূত্রের খোঁজ করব আমরা পরের অধ্যায়ে।

অধ্যায় ৩

মাঝখানের মানুষেরা

১৯৭২ সালে যে সেনাবাহিনী নিয়ে বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করে, তা খুব সুসংহত অবস্থায় ছিল না। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া অফিসাররা যুদ্ধ চলাকালেই এক দফা পদোন্নতি পেয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর তাঁদের চাকরিতে আরও দুই বছরের জ্যেষ্ঠতা যোগ করা হয়। সিদ্ধান্তটি ন্যায্য মনে হলেও এর একটি অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যুদ্ধ শেষে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা অফিসার ও সৈনিকরা নিজেদের বঞ্চিত মনে করতে শুরু করেন। তাঁদের সংখ্যাও মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের চেয়ে বেশি ছিল। মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররা তাঁদের নিজেদের ত্যাগের কথা বলতেন; অন্যদিকে, প্রত্যাগতরা ভাবতেন তাদের পেশাদারিত্ব ও প্রশিক্ষণ অবহেলিত হচ্ছে। এই মানসিক বিভাজন সেনাবাহিনীর প্রতিটি স্তরে এক ধরনের চাপা উত্তেজনার জন্ম দেয়।

জিয়াউর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন ব্রিগেড কমান্ডার। ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে কে. এম. শফিউল্লাহকে সেনাপ্রধান এবং জিয়াউর রহমানকে উপ-সেনাপ্রধান করা হয়। সর্বোচ্চ পদ না পাওয়ায় জিয়ার মনে এক ধরনের অতৃপ্তি থেকে থাকতে পারে। তবে তার আচরণে সেই অতৃপ্তির কোনো বহিঃপ্রকাশ কখনো ঘটেনি। বরং জিয়া একজন বিচক্ষণ পেশাদার সৈনিকের ভাবমূর্তি বজায় রেখে সবসময় নিজেকে বঙ্গবন্ধুর প্রতি অনুগত হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

খন্দকার মোশতাক আহমেদ ছিলেন শেখ মুজিবের চেয়েও পুরোনো রাজনীতিবিদ। ১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। সেদিনের প্রথম কমিটিতে শেখ মুজিব ও খন্দকার মোশতাক দুজনেই সহ-সম্পাদক ছিলেন; একই পদে, একই সারিতে। কিন্তু পরের দুই দশকে তাঁদের রাজনৈতিক পথ সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। মুজিব দলের নেতৃত্বে উঠে এলেন, জাতির পিতার মর্যাদা পেলেন। আর মোশতাক থেকে গেলেন মধ্যসারির একজন মন্ত্রী হিসেবে। সময়ের সাথে বাড়তে থাকা এই ব্যবধান মোশতাককে কতটা প্রভাবিত করেছিল? ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণে প্রশ্নটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

মোশতাকের রাজনীতিতে শুরু থেকেই একটি ডানপন্থী ঝোঁক ছিল। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসেও সেই ঝোঁকের প্রকাশ দেখা যায়। মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে যুদ্ধ থামিয়ে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টায় জড়িয়ে পড়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এই অভিযোগ প্রবাসী সরকারের ভেতরে তার প্রতি সন্দেহ বাড়িয়ে তোলে। তারপরও স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু তাকে মন্ত্রিসভায় রাখেন। মোশতাক দলের প্রতিষ্ঠাকালীন ও প্রবীণ নেতাদের একজন; তাকে বাদ দেওয়া রাজনৈতিকভাবে সহজ ছিল না। জিয়া ও মোশতাক দুজনেই প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুর প্রতি আনুগত্য বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু সময়ের সাথে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও কর্মকাণ্ড ভিন্ন এক বাস্তবতার কথা বলে। হয়তো একজনকে তাড়িত করেছিল বঞ্চনার বোধ, আর অন্যজনকে দীর্ঘদিনের ঈর্ষা ও ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা।

এই বিভাজনের সঙ্গে আরও যোগ হয় রাজনৈতিক আদর্শের বিভাজন। শুরুটা হয়েছিল ১৯৭০ সালের নির্বাচনেরও আগে। ‘চীনপন্থী’ বলে পরিচিত বামপন্থী রাজনীতির একটি অংশ ভারতের নকশালবাড়ি আন্দোলনের নেতা চারু মজুমদারের ‘খতমের রাজনীতি’ অনুসরণ করতে শুরু করে। নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগেই তারা আওয়ামী লীগকে ‘শ্রেণিশত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে হত্যাকাণ্ড শুরু করে। নির্বাচনের কয়েক দিনের মধ্যেই সেই সহিংসতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

১৯৭০ সালের ১৭ই ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে পাবনার সাঁথিয়া-বেড়া আসন থেকে আহমেদ রফিক এমপিএ নির্বাচিত হন। মাত্র পাঁচ দিন পর, ২২শে ডিসেম্বর, পাবনা শহরের রাঘবপুরে তাঁকে হত্যা করা হয়। তৎকালীন সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল চীনপন্থী নকশালধারার একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। নির্বাচনী বিজয়ের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই একজন সদ্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির এই হত্যাকাণ্ড দেখিয়ে দেয়, চীনপন্থী সশস্ত্র রাজনীতি তখন কতটা সক্রিয় ছিল। এও স্পষ্ট হয় যে, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের সংঘাত কতটা গভীরে পৌঁছে গিয়েছিল।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের পর বাংলাদেশের থানাগুলো থেকে অস্ত্র নিয়ে স্থানীয় প্রতিরোধ শুরু হয়। তখন এই চীনপন্থী সহিংস গোষ্ঠীগুলোও সেই প্রতিরোধে যোগ দেয়। তবে তাদের এই প্রতিরোধ মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আনুগত্য থেকে নয়; বরং তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল অস্ত্র সংগ্রহ। এই আদর্শিক বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন এপ্রিলের মাঝামাঝি চীন পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়। সেই অবস্থানের প্রতিধ্বনি শোনা যায় চারু মজুমদারের এক মন্তব্যে, যেখানে তিনি মুক্তিযুদ্ধকে ‘দুই কুকুরের লড়াই’ বলে অভিহিত করেন। এর ফলে দেশের চীনপন্থী উপদলগুলোর একটি বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতায় চলে যায়, অথবা যুদ্ধ থেকে দূরত্ব বজায় রাখে। ডিসেম্বরে বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয়ের পরও ইপিসিপি (এমএল), ইবিসিপি (এমএল) এবং সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বাধীন সর্বহারা পার্টি বাংলাদেশের স্বাধীনতা না মেনে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়ে যায়।

মুক্তিযুদ্ধের পর আওয়ামী লীগের ভেতর থেকেই তুলনামূলক তরুণ একটি অংশ বের হয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠন করে। একপর্যায়ে তারাও সশস্ত্র রাজনীতির পথ বেছে নেয়। মুক্তিযুদ্ধে আহত বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল আবু তাহের সরকারি একটি দায়িত্বশীল পদে থাকা অবস্থাতেই জাসদের গোপন রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। অন্যদিকে, প্রবীণ নেতা মওলানা ভাসানী ভারতবিরোধী রাজনীতির একটি ধারা শুরু করেন, যদিও মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি নিজেই ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এই স্ববিরোধিতা সেই সময়কার রাজনৈতিক বিভ্রান্তির একটি ভালো উদাহরণ।

গণমাধ্যম আর বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনেও এই আদর্শিক বিভাজনের ছাপ পড়ে। এনায়েতুল্লাহ খানের সাপ্তাহিক হলিডে এবং শাহাদাত চৌধুরীর বিচিত্রা আওয়ামী লীগ-বিরোধী প্রচারণায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের ঐতিহ্যবাহী দৈনিক ইত্তেফাকও একসময় সরকারবিরোধী প্রচারণায় যুক্ত হয়। এখানে উল্লেখ্য, ইত্তেফাকের মালিকপক্ষ একদিকে যেমন মার্কিনপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিল, আবার আওয়ামী লীগের সঙ্গেও তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। অর্থাৎ, সরকারবিরোধী প্রচারণা কোনো একক মতাদর্শ থেকে আসেনি; বাম ও ডান উভয় দিক থেকেই এসেছে।

এই রাজনৈতিক বিভাজনের ছায়া সেনাবাহিনীর তরুণ অফিসারদের উপরও পড়েছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে মেজর নূর চৌধুরী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন বলে জানা যায়। সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টির সঙ্গেও তার যোগাযোগের কথা জানা যায়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জড়িত আরেক সেনা কর্মকর্তা শরিফুল হক ডালিম অতীতে জাতীয় ছাত্র সংস্থা (এনএসএফ)-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আইয়ুব খানের আমলে সংগঠনটি সরকার-ঘনিষ্ঠ ছাত্ররাজনীতির প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত ছিল। মেজর সৈয়দ ফারুক ও তার ভায়রা রশিদের ক্ষেত্রে লিবিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে আগে থেকেই কোনো যোগাযোগ ছিল কি না, সেই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। তবে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর লিবিয়ায় তাদের যে অভ্যর্থনা দেওয়া হয়েছিল, তাতে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়।

এই বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার মধ্যে একটি মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ডান হোক বা বাম, প্রায় সব ধারাই কোনো না কোনোভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। আর এসব ধারার প্রভাব সেনাবাহিনীর তরুণ অফিসারদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল।

এর সঙ্গে আরেকটি গভীর কাঠামোগত সমস্যার দিকেও নজর দেওয়া দরকার। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রায় সব অফিসার, এমনকি মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররাও, পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রায় পুরোটা সময়ই কেটেছে সামরিক শাসনের অধীনে। ফলে সেই সেনাবাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে বেসামরিক রাজনীতিবিদ ও নির্বাচিত সরকারের প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা গভীরভাবে প্রোথিত ছিল। নব্য ভূমিষ্ঠ বাংলাদেশের নতুন সেনাবাহিনীও সেই মানসিকতা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি; পরবর্তী ইতিহাস অন্তত সেদিকেই ইঙ্গিত করে। বাংলাদেশে সামরিক শাসনের সূচনা হয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রজন্মের অফিসারদের হাত ধরেই।

১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেতরে শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের একটি গভীর সংকট তৈরি হয়। জ্যেষ্ঠতা নিয়ে বিরোধ, বাম-ডান রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রভাব এবং পাকিস্তানি সামরিক মানসিকতার ছায়া– সব মিলিয়ে সেনাবাহিনীকে একটি ভঙ্গুর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে পরিণত করে। এমন আবহ ভেতরের বা বাইরের ষড়যন্ত্রকারীদের জন্য এক আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। জিয়াউর রহমান ও খন্দকার মোশতাক– এই দুই মধ্যপর্যায়ের কুশীলব তথা অপারেটিভ– প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুর প্রতি আনুগত্যের মুখোশ পরে এই ভঙ্গুরতার মধ্যেই নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছিলেন। অপেক্ষায় ছিলেন শুধু সঠিক সময়ের।

পরের অধ্যায়ে আমরা দেখব, কীভাবে এই প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিরতার মধ্যে একদল তরুণ মেজর তাদের ব্যক্তিগত ক্ষোভকে একটি রক্তক্ষয়ী পরিকল্পনায় রূপ দিলেন। আর ১৫ই আগস্টের সেই ভোরে ঠিক কী ঘটেছিল।

অধ্যায় ৪

ভোরের আগে

১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থা বাতিল করে রাষ্ট্রপতিশাসিত নতুন কাঠামো প্রবর্তন করা হয়। একই সঙ্গে গঠিত হয় বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল)। পরবর্তীতে বাকশালকে ‘একদলীয় শাসনব্যবস্থা’ হিসেবে ব্যাপকভাবে তুলে ধরা হলেও, এই ব্যাখ্যা বিষয়টিকে অতিসরলীকরণ করে। বাস্তবে বাকশাল ছিল একটি জাতীয় সরকার কাঠামো, যেখানে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশ (সিপিবি) এবং মোজাফফর আহমদের ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিও যোগ দেয়। এই কাঠামোর প্রতি জিয়াউর রহমানও আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। এমনকি বাকশালের সদস্যপদের জন্যও তিনি আবেদন করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া অনেক রাষ্ট্রেই এই ধরনের জাতীয় সরকার মডেল বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়কালে দেখা গিয়েছিল। যেমন, মিশরে নাসেরের শাসনে ভূমি সংস্কার ও বৃহৎ রাষ্ট্রীয় খামার ব্যবস্থা ছিল। তানজানিয়ায় জুলিয়াস নায়ারের উজামা নীতিতে গ্রামীণ সমষ্টিকরণ ছিল। সিরিয়া ও ইরাকে বাথ পার্টির শাসনেও একই ধরনের কেন্দ্রীভূত, একদলীয় বা জাতীয়-ফ্রন্ট ধাঁচের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের উদ্যোগ দেখা যায়। ভূমি ব্যবস্থাপনা ও সমবায়ভিত্তিক খামার নিয়ে বাকশালের ধারণাও ছিল এই বৈশ্বিক ধারারই একটি বাংলাদেশি রূপ; বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্ভাবন নয়।

এখানে একটি বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা সংশোধন করা দরকার। বাংলাদেশের জনপরিসরে প্রায়ই বলা হয়, বাকশাল প্রতিষ্ঠার কারণেই সিআইএ বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়েছিল। বিষয়টি এতটা সরল নয়। আগের অধ্যায়গুলোতে আমরা দেখিয়েছি, বাকশাল গঠনের অনেক আগেই বঙ্গবন্ধু কিসিঞ্জারের অপছন্দের তালিকায় চলে গিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের বেইজিং বৈঠক থেকে শুরু করে ১৯৭৪ সালের খাদ্যসাহায্য বিতর্ক পর্যন্ত তার প্রমাণ পাওয়া যায়। বরং বাকশাল গঠনের কারণ খুঁজতে হলে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির দিকে তাকাতে হবে। দেশজুড়ে বিভিন্ন সশস্ত্র উপদলের সহিংসতা থামছিল না; এমনকি এতে আওয়ামী লীগের সাতজন সংসদ সদস্য পর্যন্ত নিহত হন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ১৯৭৪ সালের বন্যা ও দুর্ভিক্ষ। দেশের সার্বিক পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। এসব বাস্তবতা বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করার দিকে ঠেলে দেয়। স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে তিনি এমন একটি পদক্ষেপ নিতে চাননি। অনেকে মনে করেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্য শুরু থেকেই উদার সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে একটি শক্তিশালী জাতীয় সরকার কাঠামো গ্রহণ করা উচিত ছিল। সেদিক থেকে দেখলে, বাকশাল তিন বছর দেরিতে এসেছিল।

এই পরিবর্তনের প্রভাব সেনাবাহিনীতেও পড়ে। বাকশাল গঠনের পর সরকারি কর্মকর্তা ও সেনা কর্মকর্তাদের সামনে নতুন কাঠামোর প্রতি আনুগত্যের প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। সেনাবাহিনী ইতোমধ্যেই জ্যেষ্ঠতা-সংক্রান্ত বিরোধ ও রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল। তার ওপর নতুন এই রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস আরও চাপ সৃষ্টি করে। বামপন্থী ও ডানপন্থী– উভয় দিক থেকেই সরকারকে অজনপ্রিয় করে তোলার প্রচারণা চলছিল। বাকশাল গঠনের পর সেই প্রচারণা কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রক্ষমতার সমালোচনায় নতুন মাত্রা পায়। রক্ষী বাহিনীর কঠোর অভিযানের খবরও ছড়িয়ে পড়তে থাকে, যা সাধারণ মানুষ ও সেনাবাহিনীর একাংশের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করে।

এই বাতাবরণেই কয়েকজন তরুণ মেজরের ব্যক্তিগত ক্ষোভ ধীরে ধীরে একটি সংগঠিত পরিকল্পনায় রূপ নিতে শুরু করে। মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান ছিলেন নবগঠিত বেঙ্গল ল্যান্সার্স ট্যাংক রেজিমেন্টের প্রথম অধিনায়ক। তার ভায়রা খন্দকার আবদুর রশীদও একই সাঁজোয়া কোরে কর্মরত ছিলেন। এই দুজনকে ঘিরে যে ষড়যন্ত্রের বৃত্ত গড়ে ওঠে, তাতে যোগ দেন মেজর শরিফুল হক ডালিম, মেজর নূর চৌধুরী, মেজর শাহরিয়ার রশীদ খান, মেজর আজিজ পাশা, মেজর মহিউদ্দিন, ক্যাপ্টেন বজলুল হুদাসহ আরও কয়েকজন তরুণ কর্মকর্তা।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জড়িত সেনাসদস্যদের নানা ‘ব্যক্তিগত ক্ষোভের’ বিবরণ নিয়েও সতর্ক থাকা দরকার। ডালিমের ব্যক্তিগত অপমানের একটি গল্প বাংলাদেশের জনপরিসরে বহুল প্রচলিত। কিন্তু এর উৎস মূলত মৌখিক; নির্ভরযোগ্য দলিল দিয়ে তা প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই এই বইয়ে আমরা সেই কাহিনির বিস্তারিত বর্ণনায় যাব না। তবে একটি বিষয় তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। এই অফিসারদের মধ্যে সামরিক পদোন্নতি নিয়ে অসন্তোষ ছিল, শৃঙ্খলাজনিত শাস্তি নিয়েও ক্ষোভ ছিল। ১৯৭৫ সালের ২০শে মার্চ সন্ধ্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাতের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেদিন মেজর ফারুক জিয়াউর রহমানের বাসায় গিয়ে তাকে বলেন, ‘দেশের একটি পরিবর্তন প্রয়োজন।’ এই সাক্ষাতের বিবরণ আমরা পাই পরবর্তীকালে ফারুক ও রশীদের নিজেদের সাক্ষাৎকার থেকেই।

আগস্টের প্রথম সপ্তাহে যে নৈশভোজে ফিলিপ চেরি ও জিয়াউর রহমানের সাক্ষাৎ হয়েছিল, তার কথা আমরা আগের অধ্যায়ে দেখেছি। সেই বৈঠকের পরপরই বঙ্গবন্ধু হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত রূপ নিতে শুরু করে। ১৪ই আগস্ট রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ মেজর ডালিম, মেজর নূর চৌধুরী, ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা, মেজর শাহরিয়ার রশীদ, মেজর আজিজ পাশা ও মেজর রাশেদ চৌধুরী একত্রিত হন। রাতের শেষ প্রহরে, মেজর ফারুক তার অধীনস্থ সেনা কর্মকর্তাদের বিমানবন্দরের কাছে সেকেন্ড ফিল্ড আর্টিলারির হেডকোয়ার্টারে সমবেত হওয়ার নির্দেশ দেন।

১৫ই আগস্ট ভোর সাড়ে পাঁচটার কিছু আগে ধানমন্ডিতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল। মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা তখন চ্যান্সারির দিকে রওনা দিলেন। পথে তাঁরা ভারী ট্যাংক বহরের মুখোমুখি হন। বেঙ্গল ল্যান্সার্সের সেই একই ট্যাংক রেজিমেন্ট, যার অধিনায়ক ছিলেন মেজর ফারুক। দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে পাঠানো প্রথম তারবার্তায় লেখা হয়, মুজিবের বাড়ির আশপাশে বিস্ফোরণ হয়েছে। তাঁর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণির বাড়িতে ভারী গোলাগুলি হয়েছে। প্রতিবেশীরা বলছেন, তিনি নিহত। কৃষিমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, যিনি মুজিবের ভগ্নিপতি ছিলেন, তাঁকেও হত্যা করা হয়েছে। সকাল সাতটার মধ্যে সারা দেশে কারফিউ জারি হয়ে যায়।

সেনাপ্রধান কে এম সফিউল্লাহ পরবর্তীকালে বহুবার স্বীকার করেছেন, সেই ভোরে তিনি বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেননি। তিনি এই ব্যর্থতাকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। উপ-সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান সেই সকালে ঠিক কী ভূমিকা রেখেছিলেন, প্রত্যক্ষ নাকি পরোক্ষ, এই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই নির্ভর করে কোন সাক্ষ্যকে কতটা বিশ্বাস করা হচ্ছে তার ওপর। ১৯৭৬ সালের আগস্টে ফারুক ও রশীদ ইংল্যান্ডের আইটিভি চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বিস্তারিত বিবরণ দেন। সেই সাক্ষাৎকারেই তারা দাবি করেন, ১৫ই আগস্টের অনেক আগে থেকেই জিয়া তাদের পরিকল্পনার কথা জানতেন। এমনকি তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জিয়া বলেছিলেন, ‘সফল হলে আমার কাছে এসো, ব্যর্থ হলে আমাকে জড়িও না।’ একই সাক্ষাৎকারে তারা হত্যাকাণ্ডের একটি আদর্শিক ব্যাখ্যাও তুলে ধরেন। তাদের দাবি, বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের পথ থেকে সরিয়ে আনার উদ্দেশ্যেই ফারুক-রশীদরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেন। এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ইঙ্গিত দেয় যে মাস্টারমাইন্ডরা ঠিক কোন ধরনের ক্ষোভকে কাজে লাগাতে চেয়েছিল। ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রবিরোধী সেই মতাদর্শিক প্রবণতা, যা আমরা আগের অধ্যায়ে চীনপন্থী ও ইসলামপন্থী– উভয় ধারার মধ্যেই দেখেছি। তবে এসব বক্তব্য তাদের নিজেদের বয়ান; এর পক্ষে কোনো স্বাধীন প্রমাণ নেই। এগুলোকে তাদের কর্মকাণ্ডের একটি আদর্শিক ব্যাখ্যা বা আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেনাবাহিনী, রক্ষী বাহিনী, ও পুলিশ– সব বাহিনীর নেতৃত্ব নবগঠিত সরকারের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেয়। মাসের পর মাস ভেতরে ভেতরে ভঙ্গুর হয়ে ওঠা সেনাবাহিনীর এই প্রতিরোধহীন আত্মসমর্পণ একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয়। এই সেনা-অভ্যুত্থান শুধু বিচ্ছিন্ন কয়েকজন মেজরের দুঃসাহসিক পরিকল্পনার ফল ছিল না। এটি এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতার মধ্যে ঘটেছিল, যেখানে কার্যকর প্রতিরোধের কোনো বাস্তব সম্ভাবনাই আর অবশিষ্ট ছিল না।

১৫ই আগস্ট সকালে একটি ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে। ঢাকার একটি ব্রিগেডের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার শাফায়াত জামিল ছুটে যান জিয়াউর রহমানের বাসায়। জিয়া তখন সবে শেভ করছিলেন। অর্ধেক শেভ করা মুখেই তিনি ঘুমের পোশাকে বেরিয়ে আসেন। শাফায়াত জামিল তাকে জানান, দুটি ব্যাটালিয়ন সম্ভবত একটি সেনা-অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। রেডিওতে রাষ্ট্রপতির মৃত্যুর ঘোষণা আসছে। কিন্তু বাইরে ঠিক কী ঘটেছে, তা তখনো তারা জানেন না। জিয়ার জবাব ছিল বিস্ময়করভাবে নির্লিপ্ত– ‘সো হোয়াট? লেট ভাইস প্রেসিডেন্ট টেক ওভার’। অর্থাৎ, ‘তাতে কী? উপ-রাষ্ট্রপতিকে দায়িত্ব নিতে দাও’। জিয়া আরও বলেন, এর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই; এটি রাজনীতির বিষয়। একজন সেনা কর্মকর্তার কাছে দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রনেতার মৃত্যুসংবাদ যতটা বিস্ময় ও উদ্বেগের জন্ম দেওয়ার কথা, জিয়ার প্রতিক্রিয়ায় তার ছিটেফোঁটাও ছিল না। এই নির্লিপ্ততা তার আগাম অবগতির প্রমাণ কি না, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে এটি অন্তত এটুকু বলে দেয়, খবরটি তার কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল না।

১৫ই আগস্ট থেকে ৩রা নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় আড়াই মাস সময়কালে বাংলাদেশ এক অদ্ভুত ক্ষমতা-কাঠামোর মধ্য দিয়ে যায়। মোশতাক ছিলেন নামমাত্র রাষ্ট্রপতি; ২৫শে আগস্ট থেকে জিয়াউর রহমান নামমাত্র সেনাপ্রধান। কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা ছিল খুনি মেজরদের হাতে। অস্ত্র হাতে তারা অবাধে বঙ্গভবনে চলাফেরা করতেন। মন্ত্রী-আমলাদের ওপর তাদের প্রভাব ছিল প্রশ্নাতীত। রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রধান ও প্রকৃত ক্ষমতাধরদের মধ্যে এই ফারাকটাই সেই আড়াই মাস বাংলাদেশকে কার্যত একটি জিম্মি রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল।

পরের অধ্যায়ে আমরা দেখব, এই মেজররা কীভাবে নভেম্বরের মধ্যে দেশ ছেড়ে লিবিয়ায় আশ্রয় পেলেন এবং কীভাবে একটি অধ্যাদেশ তাদের কার্যত স্থায়ী দায়মুক্তি এনে দিল।

অধ্যায় ৫

পুরস্কার ও দায়মুক্তি

১৯৬৯ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফি একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে লিবিয়ার সাম্রাজ্যবাদ-অনুগত রাজতন্ত্রকে উৎখাত করেন। গাদ্দাফির এই সামরিক অভ্যুত্থানের অনুপ্রেরণা এসেছিল মিশরে নাসেরের বিপ্লব আর সিরিয়া-ইরাক জুড়ে বিস্তৃত বাথ পার্টির আদর্শ থেকে। গাদ্দাফি নিজেকে নাসেরের একজন অনুসারী হিসেবেই দাবী করতেন। কিন্তু নাসের আর বাথ পার্টির আদর্শের সঙ্গে গাদ্দাফির একটি মৌলিক পার্থক্য ছিল। নাসের আর বাথ পার্টি একসঙ্গে জাতীয়তাবাদী, সমাজতান্ত্রিক, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আর ধর্মনিরপেক্ষ ছিল। গাদ্দাফি নিজেকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আর সমাজতান্ত্রিক দাবি করলেও ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন না। বরং বিপ্লবে ইসলামকে যুক্ত করে তিনি একটি আন্তর্জাতিক ইসলামি বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতেন; নিজেকে সেই বিপ্লবের বিশ্বনেতা হিসেবে কল্পনা করতেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নাসেরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। কথিত আছে, তাঁর দ্বিতীয় পুত্রের নাম জামাল রাখার পেছনে জামাল আব্দেল নাসেরের প্রতি এই শ্রদ্ধাই কাজ করেছিল। সিরিয়া ও ইরাকের বাথ সরকারের সঙ্গেও তাঁর ভালো সম্পর্ক ছিল। দুই দেশই স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে বঙ্গবন্ধু প্রকাশ্যে আরবদের পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি মিশর ও ইরাকে রাষ্ট্রীয় সফরও করেন। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর আন্তর্জাতিক সহানুভূতি ছিল নাসের-বাথ ধারার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের দিকে, গাদ্দাফির ইসলামি বিপ্লবী জাতীয়তাবাদের দিকে নয়।

গাদ্দাফির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ইতিহাস অবশ্য একরৈখিক ছিল না। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় গাদ্দাফি স্পষ্টভাবে পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। লিবিয়ার এফ-৫ যুদ্ধবিমান পাকিস্তানের সারগোদা বিমানঘাঁটিতে মোতায়েন করা হয়েছিল, সম্ভবত পাকিস্তানি পাইলটদের প্রশিক্ষণের জন্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় ইন্দিরা গান্ধী সকল রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে চিঠি লিখে ভারতের অবস্থান জানান এবং বাংলাদেশে পাকিস্তানের নৃশংসতা বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন কামনা করেন। গাদ্দাফি সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে জবাব দেন, ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে যোগসাজশ করে জাতিসংঘের প্রস্তাব ঠেকাচ্ছে; আর পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে বল প্রয়োগের কোনো আইনি অধিকার কারও নেই। এই চিঠি-বিনিময় বৈরুতের একটি আরবি দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছিল। পরে একটি ভারতীয় সাময়িকীতেও অনূদিত হয়ে ছাপা হয়।

অথচ মাত্র তিন বছর পর, ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে, পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামি সম্মেলন সংস্থার দ্বিতীয় শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ানোর পেছনে যে আরব-আফ্রিকান নেতারা দূতিয়ালির ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন মিশরের আনোয়ার সাদাত, আলজেরিয়ার হুয়ারি বুমেদিন, প্যালেস্টাইনের ইয়াসির আরাফাত, ইরানের শাহ এবং গাদ্দাফি। ভারতের সঙ্গেও গাদ্দাফির সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে, যার সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছায় ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর লিবিয়া সফরের মধ্য দিয়ে। এই সফরকে পরবর্তীতে ভারত সরকার নিজেই দুই দেশের সম্পর্কের সর্বোচ্চ পর্যায় বলে বর্ণনা করে।

অর্থাৎ, যে গাদ্দাফি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেছিলেন, তিনিই ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পক্ষে দাঁড়ালেন, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের আশ্রয় দিলেন, আর তারপরও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এমনভাবে স্বাভাবিক করলেন যে, এক দশকের মধ্যেই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী তার দেশে রাষ্ট্রীয় সফরে যান। এই পুরো সময়রেখা প্রমাণ করে, গাদ্দাফির সিদ্ধান্তগুলো কোনো স্থায়ী আদর্শিক অবস্থান থেকে আসেনি; বরং প্রতিটি মুহূর্তের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ থেকে এসেছে।

এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন পাঠকের মনে স্বাভাবিকভাবেই আসতে পারে। যদি ধরে নেওয়া হয় বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে ওয়াশিংটনের ইঙ্গিত ছিল, তাহলে খুনিরা কেন আশ্রয় পেলেন এমন একটি দেশে, যে দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক তখন শুধু বৈরীই নয়, রীতিমতো শত্রুতাপূর্ণ ছিল? বাস্তবে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির হিসাব-নিকাশ কখনো সরলরৈখিক হয় না। ইতিহাসে এই ধরনের আপাত-অসংগতি অস্বাভাবিক নয়; বরং ঘন ঘন ঘটে। আর পাঠককে এই জটিলতা মাথায় রেখেই এগোতে হবে।

এই আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়– ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নীরবতা। ১৯৭১ সালে যে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর পক্ষে অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন, পঁচাত্তরের আগস্টে তাঁর সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল রহস্যজনকভাবে সংযত। মুজিব হত্যাকাণ্ডের পরের মাসগুলোতে কিছু ভারতীয় সংবাদপত্র মার্কিন সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে প্রতিবেদন প্রকাশ করছিল। এই পরিস্থিতিতে কিসিঞ্জারের নির্দেশে দিল্লিতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ভারত সরকারকে জানান, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এসব অভিযোগের বিষয়ে তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এই চাপ প্রয়োগের কাজটি সহজ হয়েছিল একটি কাকতালীয় কারণে। ১৯৭৫ সালের ২৫শে জুন, বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রায় সাত সপ্তাহ আগে, ইন্দিরা গান্ধী নিজেই ভারতে জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন। সংবাদপত্রের কার্যালয়ে সরকারি সেন্সরও বসিয়ে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠতম আন্তর্জাতিক মিত্রের এই নীরবতা তাই সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না। এর পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক চাপ এবং একটি কাকতালীয় ঘরোয়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট– দুটোই কাজ করেছিল।

এই পটভূমিতে মোশতাক সরকারের শুরুর দিনগুলোর দিকে তাকানো যাক। সারা বিশ্বের মধ্যে পাকিস্তানই সবচেয়ে দ্রুত মোশতাক সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। ১৫ই আগস্টেই পাকিস্তান থেকে উপহার হিসেবে বিমানভর্তি সরু চাল ঢাকায় আসে। সেদিন রেডিওতে মেজর ডালিম বাংলাদেশকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন। এই ঘোষণা পাকিস্তান, লিবিয়া ও সৌদি আরবকে বিশেষভাবে সন্তুষ্ট করে; চীনও দ্রুত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে গাদ্দাফির ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের কথা মাথায় রাখলে, খুনি মেজরদের লিবিয়ায় আশ্রয় পাওয়ার পেছনে পাকিস্তানের প্রভাব থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পাশাপাশি, গাদ্দাফির নিজস্ব ইসলামি বিপ্লবের উচ্চাকাঙ্ক্ষাও হয়তো এই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছিল।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরপরই খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি হলেন; ২৫শে আগস্ট তিনি জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান নিযুক্ত করলেন। এই দু'টো নিয়োগই মূলত খুনি মেজরদের সম্মতি ও চাপে হয়েছিল। ১৫ই আগস্টের পর ক্ষমতার লাগাম কার্যত তাদেরই হাতে ছিল। কিন্তু এই বন্দোবস্ত স্থায়ী হলো না। ৩রা নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটল। জিয়াউর রহমান গৃহবন্দী হলেন। খালেদ নিজে রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করলেন না। বরং মোশতাককে ক্ষমতায় রেখেই তার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করলেন, যাতে খুনি মেজররা আত্মসমর্পণ করে।

সেদিন সকাল আটটা দশ মিনিটে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে রাষ্ট্রদূত ইউজিন বোস্টারের কাছে একটি ফোন আসে। ফোনের ওপাশে ছিলেন স্বয়ং মোশতাক; কণ্ঠে অস্থিরতা। দুপুরের মধ্যেই মোশতাকের মুখ্য সচিব মাহবুবুল আলম চাষী দূতাবাসে যোগাযোগ করে জানতে চান, পরিস্থিতি খারাপ হলে বাংলাদেশের বিশেষ কিছু ব্যক্তিকে যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে পারবে কি না। বোস্টার সরাসরি জিজ্ঞেস করেন, তিনি কি মেজর ফারুক ও মেজর রশীদের কথা বলছেন? উত্তর আসে, ‘হ্যাঁ।’ চাষী আরও জানান, প্রয়োজন হলে মোশতাক নিজেও তাদের সঙ্গী হতে পারেন; সঙ্গে জেনারেল ওসমানী, খলিল বা জিয়ার মতো আরও কেউ।

বোস্টার কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি। শুধু বলেছিলেন, তিনি দেখছেন কী করা যায়। রাতে যখন আবার যোগাযোগ হলো, ততক্ষণে চিত্র বদলে গেছে। নতুন সরকারের প্রটোকল প্রধান জানিয়ে দিলেন, শুধু সেনা কর্মকর্তাদের দেশত্যাগে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে। মোশতাক সেই তালিকায় নেই। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত মোশতাককে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। আর মেজরদের ক্ষেত্রেও এটি প্রকৃতপক্ষে কোনো মার্কিন আশ্রয় ছিল না। বরং এটি ছিল বঙ্গভবন ও সেনানিবাসের মধ্যে একটি ঘরোয়া সমঝোতা, যাতে মেজররা নিরাপদে দেশ ছেড়ে যেতে পারেন। শর্ত একটাই– খুনি মেজররা যাতে আর কোনো ঝামেলা না করে।

এই ঘটনাটাও সেই একই আন্তর্জাতিক নকশার অংশ, যেখানে একটি পরাশক্তি ফুটসোলজারদের দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়, কিন্তু কাজ শেষ হলে তাদের দায় নিজের ঘাড়ে নেয় না। মোশতাকের নিরাপত্তার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র নমনীয়, প্রায় সহানুভূতিশীল; কিন্তু যারা সরাসরি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল, তাদের দায় নিতে অনাগ্রহী। এই বৈপরীত্যের মধ্যেই সেই নকশার ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়।

এই সমঝোতার আড়ালে সেই রাতে আরেকটি নৃশংস ঘটনা ঘটল। জাতীয় চার নেতা– সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান– যারা মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে মুজিবনগর সরকার পরিচালনা করেছিলেন, ১৫ই আগস্টের পরপরই তাঁরা গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন। ৩রা নভেম্বর রাতে, খুনি মেজররা ব্যাংককের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে, এই চার নেতাকে কারাগারের ভেতরেই হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ড মোশতাকের নির্দেশে ঘটেছিল বলে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে একটি সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্যও কাজ করে থাকতে পারে। এই চার নেতা বেঁচে থাকলে, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের বৈধতার সুবাদে তাঁদের ঘিরে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির একটি বিকল্প ধারাবাহিকতা গড়ে উঠতে পারত। তাঁদের হত্যা করে খুনিরা হয়তো বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির পুনরুত্থানের সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিতে চেয়েছিলেন।

৩রা নভেম্বর রাত সাড়ে আটটায় তেজগাঁও থেকে বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইট আকাশে উড়ল; চট্টগ্রামে জ্বালানি নিয়ে থাইল্যান্ডের পথ ধরল। ৪ঠা নভেম্বর ভোরে ব্যাংককে অবতরণ করল সেই বিমান। মেজররা, তাদের অধস্তন কর্মকর্তা ও পরিবারের সদস্য মিলিয়ে মোট উনত্রিশ জন যাত্রী ছিলেন তাতে। ব্যাংকক থেকে মেজররা পাকিস্তানে আশ্রয় পাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপরই লিবিয়ার দরজা খুলে যায় তাদের জন্য।

লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর মেজরদের মধ্যে একটি বিভাজন দেখা যায়। বেশিরভাগ মেজর বিভিন্ন দেশে জিয়াউর রহমানের দেওয়া কূটনৈতিক পদ মেনে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন; কিন্তু ফারুক ও রশীদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাতেই থেমে থাকেনি। মাঝে একবার তারা দেশে ফিরে জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেন। কৌশলী জিয়া সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তাদের বিতাড়িত করেন। এরপর ফারুক আর রশীদ লিবিয়ায় ফিরে গাদ্দাফির অর্থে নির্মাণ ও জনশক্তি রপ্তানি খাতে ব্যবসা শুরু করেন। এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন বাংলাদেশের গ্যাটকো কোম্পানির প্রধান মূসা বিন শমসের। বাংলাদেশ থেকে অনেক তরুণকে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়; তাদের একটি অংশকে অস্ত্র প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তাদের কয়েকজনকে দেশে ফিরিয়ে এনে ফারুক ও রশীদ গঠন করেন ফ্রিডম পার্টি। দলটির অন্যতম গোপন উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা।

গাদ্দাফির বাংলাদেশ-সংযোগ শুধু সামরিক আশ্রয়দানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ইসলামি সমাজতন্ত্রের আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষক হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষায় গাদ্দাফি বিভিন্ন মুসলিমপ্রধান দেশে বিনিয়োগ শুরু করেন। বাংলাদেশে সেই বিনিয়োগের অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠেন লেখক আহমদ ছফা। তাঁর মাধ্যমে জাসদের মুখপত্র গণকণ্ঠ প্রথমে লিবিয়ার অর্থসাহায্য পায়। পরে ছফা নিজেই গাদ্দাফির অর্থায়নে ‘উত্তরণ’ নামের একটি প্রেস এবং একই নামের একটি পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন। ছফা ও অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ মিলে গাদ্দাফির গ্রিন বুক-এর বাংলা অনুবাদও প্রকাশ করেন। ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ব্রাদার গাদ্দাফি কিন্ডারগার্টেন’।

ছফা, এমাজউদ্দিন ও জাসদের মেজর জলিল মিলে লিবিয়ায় বাংলাদেশি তরুণ পাঠানোও শুরু করেন। তাদের একটি অংশ ছিল জাসদের গণবাহিনীর ক্যাডার, যাদের কেউ কেউ পরবর্তীতে ফ্রিডম পার্টির ক্যাডার হয়ে দেশে ফিরে আসেন; বাকিরা ছিলেন নিছক পাচারের শিকার। পুরো ঘটনাপ্রবাহ থেকে যে চিত্রটি পাওয়া যায়, তাতে গাদ্দাফির বাংলাদেশ-সংযোগকে শুধু কয়েকজন খুনি মেজরের সঙ্গে দহরম-মহরম হিসেবে দেখলে বিষয়টির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। এর পেছনে ছিল আরও বিস্তৃত একটি আদর্শিক ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, যেখানে নিজ নিজ স্বার্থ ও উদ্দেশ্যে বামপন্থী ও ইসলামপন্থী– দুই ধারার মানুষই যুক্ত হয়েছিলেন।

এই ফ্রিডম পার্টি পরবর্তীতে বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতেও প্রবেশ করে। ১৯৮৮ সালের ৩রা মার্চ, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচন বর্জনের মধ্যে অনুষ্ঠিত চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে, ফ্রিডম পার্টি কুড়াল প্রতীকে অংশ নেয় এবং দুটি আসনে জয়ী হয়। মেজর বজলুল হুদা মেহেরপুর-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধুর এই আত্মস্বীকৃত ঘাতকের ফাঁসি কার্যকর হয় ২০১০ সালে। কে এম মান্নান কুমিল্লা-৬ আসন থেকে জয়ী হন। ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বর্জনের মধ্যে অনুষ্ঠিত একতরফা ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে, কর্নেল খন্দকার আবদুর রশীদ কুমিল্লা-৭ আসন থেকে জয়ী হন। এই সংসদের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র বারো দিন; তবু এই সংক্ষিপ্ত সময়েই রশীদকে বিরোধীদলীয় নেতার মর্যাদা দেওয়া হয়। একজন আত্মস্বীকৃত রাষ্ট্রপতি-হত্যাকারী দেশের সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসেছিলেন– এই ঘটনাটা সেই সময়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভঙ্গুরতার এক দুঃখজনক নিদর্শন।

এবার আইনি সুরক্ষার দিকে ফেরা যাক। দায়মুক্তির এই ধারা শুধু হত্যাকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত একটি রাজনৈতিক পুনর্বাসনের অংশ হয়ে ওঠে। ১৯৭২ সালের ২৪শে জানুয়ারি প্রণয়ন করা হয় ‘বাংলাদেশ কোলাবরেটরস অর্ডার’, যা ‘দালাল আইন’ নামে পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর দোসরদের বিচারের জন্য এই আইন করা হয়। দালাল আইনে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার মামলা হয়; সাতশো বাহান্নজনের সাজা হয়। বঙ্গবন্ধু নিজে প্রায় ছাব্বিশ হাজার অভিযুক্তকে সাধারণ ক্ষমা করেছিলেন। তবে শর্ত ছিল, হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন বা অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর অপরাধে অভিযুক্তদের বিচার অব্যাহত থাকবে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাস পরই এই আইন বাতিল হয়ে যায়; সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা মুক্তি পান। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম আর পিডিপি– স্বাধীনতার পর নিষিদ্ধ এই চার পাকিস্তানপন্থী দল– প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ পায়। গোলাম আজমের মতো যুদ্ধাপরাধীরাও দেশে ফিরতে শুরু করেন। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক ধারাকে বাংলাদেশ পরাজিত করেছিল, স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মধ্যেই সেই ধারার পুনরুত্থানের পথ খুলে যায়। এরই সমান্তরালে, বঙ্গবন্ধুর খুনিরাও নিজেদের নিরাপত্তা ও পুরস্কার নিশ্চিত করছিল।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মাত্র ছয় সপ্তাহের মাথায়, ২৬শে সেপ্টেম্বর ১৯৭৫, মোশতাক সরকার ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করে– অধ্যাদেশ নম্বর ৫০। এই অধ্যাদেশ ১৫ই আগস্ট থেকে ঘটা সব হত্যাকাণ্ডের বিচার চিরতরে বন্ধ করে দেয়। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে এই অধ্যাদেশ পূর্ণ আইনে পরিণত হয়; সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে পায় সাংবিধানিক বৈধতাও। এই সুরক্ষা টিকে ছিল একুশ বছর– ১৯৯৬ সালে ইনডেমনিটি রিপিল অ্যাক্টের মাধ্যমে বাতিল না হওয়া পর্যন্ত। ‘শাহরিয়ার রশিদ খান বনাম বাংলাদেশ’ মামলায় হাইকোর্ট এবং পরে আপিল বিভাগ এই অধ্যাদেশকে মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী ও শুরু থেকেই অকার্যকর বলে ঘোষণা করে।

ইন্দিরা গান্ধীর নীরবতা ও পরবর্তী স্বাভাবিকীকরণ, ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স, লিবিয়ার আশ্রয় ও তার পেছনের আদর্শিক-কূটনৈতিক জটিলতা এবং ফ্রিডম পার্টির নির্বাচনী পুনর্বাসন– এই চারটি ঘটনা একসঙ্গে দেখলে একটি চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর খুনিরা দীর্ঘ সময় বিচারের আওতার বাইরে ছিলেন; শাস্তি পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো পেয়েছেন সুরক্ষা, ব্যবসার সুযোগ, এমনকি জাতীয় সংসদের আসনও। আর এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও দেখা যায় নীরবতা, কূটনৈতিক চাপ এবং পরবর্তী সময়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এক ধারাবাহিকতা। তবে এতে তাদের সংশ্লিষ্টতার প্রশ্নটি হারিয়ে যায় না; বরং আরও জোরালো হয়।

পরের অধ্যায়ে আমরা দেখব, দায়মুক্তির এই দীর্ঘ ছায়া অবশেষে কীভাবে কাটতে শুরু করেছিল– বাংলাদেশের সাধারণ আদালতের হাত ধরে।

অধ্যায় ৬

সাধারণ আদালতের অসাধারণ রায়

লুমুম্বা বা আলেন্দের হত্যাকারীদের কখনো কোনো আদালতে দাঁড়াতে হয়নি। বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে ইতিহাসকে হাঁটতে হয়েছে ভিন্ন পথে। যদিও সেই পথ ছিল দীর্ঘ, অজস্র বাধায় কণ্টকাকীর্ণ এবং আজও অসম্পূর্ণ। এই বিচার কোনো বিশেষ ট্রাইব্যুনালে হয়নি; হয়েছে বাংলাদেশের সাধারণ ফৌজদারি আদালতের স্বাভাবিক বিচারপ্রক্রিয়ায়, প্রায় দুই দশক ধরে চলা এক দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রথমবার ক্ষমতায় এসে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করেন এবং বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেন। বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ১৯৯৮ সালের ৮ই নভেম্বর ঢাকার দায়রা জজ কাজী গোলাম রসূল একশো একাত্তর পাতার একটি রায় ঘোষণা করেন, যাতে একাধিক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে বিচারপ্রক্রিয়া কার্যত থমকে যায়; আপিল প্রক্রিয়া বছরের পর বছর গতিহীন থাকে। ২০০৭ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামি হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ আবার সরকার গঠন করলে বিচারপ্রক্রিয়া নতুন গতি পায়। ২০০৯ সালের ১৯শে নভেম্বর আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে সেই আপিল খারিজ করে দেয়। ২০১০ সালের ২৮শে জানুয়ারি রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বজলুল হুদা, ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, এ কে এম মহিউদ্দিন ও মহিউদ্দিন আহমেদের ফাঁসি কার্যকর হয়।

আরেকজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, লেফটেন্যান্ট কর্নেল আজিজ পাশা, বিচার শেষ হওয়ার আগেই জিম্বাবুয়েতে মারা যান– পলাতক অবস্থায়। বাকিদের একজন, ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ, দুই দশকেরও বেশি সময় ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আত্মগোপনে ছিলেন। ২০২০ সালের ৭ই এপ্রিল তিনি ঢাকার গাবতলি থেকে গ্রেপ্তার হন; ১২ই এপ্রিল কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। এখনো পাঁচজন পলাতক– খন্দকার আবদুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, রিসালদার মোসলেম উদ্দিন খান, রাশেদ চৌধুরী ও নূর চৌধুরী। এই শেষ দুজনের অবস্থান নিশ্চিতভাবে জানা যায়– রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে আর নূর চৌধুরী কানাডায়। বাংলাদেশ বারবার তাদের ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানালেও দুই দেশই তা প্রত্যাখ্যান করেছে। রশিদ আর ডালিম ঠিক কোথায় আছেন, তা আজও জানা যায়নি। তবে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, গাদ্দাফির পতনের পর তারা লিবিয়ায় গড়ে তোলা সম্পদ পাকিস্তানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

এই দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্যে ঘটে একটি আপাত ব্যক্তিগত ঘটনা, যা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের আন্তর্জাতিক মাত্রাকে আবারও সামনে নিয়ে আসে। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদে গাদ্দাফি তাঁকে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে গাদ্দাফি ফারুক আর রশীদকে ক্ষমা করার অনুরোধ জানান, কুরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করে। শেখ হাসিনা পরবর্তীতে এক জনসভায় চিঠিটির কথা প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেন। গাদ্দাফির চিঠির জবাবে শেখ হাসিনাও কুরআনের আরেকটি আয়াত উদ্ধৃত করেন। প্রকাশিত সংবাদভাষ্যে শেখ হাসিনার জবাবের মূল কথা ছিল– খুনিদের বিচারের মুখোমুখি না করলে একজন কন্যা হিসেবে তিনি তাঁর বাবার প্রতি নিজের কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হবেন। একজন রাষ্ট্রনেতা, যিনি আরেক দেশের নেতার খুনিদের বছরের পর বছর আশ্রয় দিয়েছেন, ধর্মীয় গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে তাদের ক্ষমার আবেদন জানাচ্ছেন; আর নিহত নেতার কন্যা একই গ্রন্থ থেকে সেই আবেদনের জবাব দিচ্ছেন– এই সংক্ষিপ্ত চিঠি বিনিময় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পুরো ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে ওঠে।

সপরিবারে শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের আইনি বিচার এই আখ্যানে এক গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য এনে দেয়। যে ইতিহাস আমরা এতক্ষণ দেখেছি, তা মূলত দায়মুক্তির ইতিহাস– ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, লিবিয়ায় আশ্রয়, ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে সম্পদ গড়ে তোলা, এমনকি জাতীয় সংসদের আসনপ্রাপ্তিও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত, অনেক দেরিতে হলেও, বাংলাদেশের সাধারণ আদালতব্যবস্থা এই দায়মুক্তির বৃত্ত ভেঙেছিল। বিচারের শেষ অধ্যায়টি এখনও বাকি– পাঁচজন হত্যাকারী এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবুও লুমুম্বা বা আলেন্দের ইতিহাসের সঙ্গে তুলনা করলে এটি একটি উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। অন্তত কয়েকজন ঘাতক শেষ পর্যন্ত বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন– রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার আদালতে নয়, বরং স্বাভাবিক ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।

শেষ অধ্যায় ও উপসংহারে আমরা ফিরে যাব সেই মূল প্রশ্নে– লুমুম্বা, আলেন্দে এবং বঙ্গবন্ধু– এই তিন নেতার হত্যাকাণ্ডের ঘটনাপ্রবাহ কতটা একই ধারায় এগিয়েছিল, আর কোথায় পার্থক্য থেকে যায়।

উপসংহার

তিনটি নাম, একটি প্রশ্ন

১৯৬১ সালের জানুয়ারিতে কঙ্গোর প্যাট্রিস লুমুম্বাকে হত্যা করা হয়। ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে চিলিতে সালভাদর আলেন্দে মারা যান প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ঘেরাও করা সেনাবাহিনীর সামনে। ১৯৭৫ সালের আগস্টে ঢাকায় শেখ মুজিবুর রহমান খুন হন। তিনটে ঘটনা, তিনটে মহাদেশ, তিনজন ভিন্ন মানুষ। কিন্তু এই বই জুড়ে আমরা যে সুতোগুলো ধরে এগিয়েছি, সেগুলো একটি জায়গায় এসে মিলে যায়।

লুমুম্বার হত্যাকাণ্ডে শুধু সিআইএ নয়, কঙ্গোর সাবেক ঔপনিবেশিক প্রভু বেলজিয়ামও গভীরভাবে জড়িত ছিল। ২০০১ সালে বেলজিয়াম পার্লামেন্টের একটি তদন্ত কমিশন উপসংহারে পৌঁছায়: লুমুম্বাকে শত্রু-নিয়ন্ত্রিত কাটাঙ্গা অঞ্চলে স্থানান্তরের পেছনে বেলজিয়ান সরকারি কর্মকর্তাদের সহায়তা ছিল এবং এই হত্যাকাণ্ডের জন্য বেলজিয়াম নৈতিক দায় বহন করে। পরের বছর, ২০০২ সালে, বেলজিয়াম সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে লুমুম্বা হত্যাকাণ্ডের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। কিন্তু এই স্বীকারোক্তি কখনো প্রকৃত ফৌজদারি বিচারে রূপ নেয়নি। ২০২৬ সালে ব্রাসেলসের একটি আদালত লুমুম্বা হত্যাকাণ্ডে জড়িত শেষ জীবিত অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিচার শুরুর পথ খুলে দেয়। কিন্তু সেই বছরের মে মাসে তার মৃত্যুতে সেই সুযোগও চিরতরে হারিয়ে যায়। অর্থাৎ লুমুম্বার ক্ষেত্রে আইনি দায়মুক্তি কখনো ছিল না, কিন্তু বাস্তবে সেই দায়মুক্তিই টিকে ছিল ছয় দশকেরও বেশি সময়।

লুমুম্বা-আলেন্দে-মুজিব– তিনজন নেতাই একটি তৃতীয় পথ বেছে নিয়েছিলেন, পুরোপুরি পশ্চিমের নয়, আবার পুরোপুরি পূর্বেরও নয়। প্রতিটা ক্ষেত্রেই একটি পরাশক্তির কূটনৈতিক পরিকল্পনায় সেই নেতা পথের কাঁটা হয়ে উঠেছিলেন। প্রতিটা ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক চাপ, প্রচার আর দেশের ভেতরের অসন্তোষ ব্যবহার করে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যেখানে সামরিক বাহিনীর একটি অংশের হাতে শেষ কাজটা তুলে দেওয়া সহজ হয়ে উঠেছিল। আর প্রতিটা ক্ষেত্রেই যারা সরাসরি বন্দুক চালিয়েছিল, তারা ইতিহাসের কেন্দ্রীয় কোন চরিত্র নয়; বরং আরও বড় একটি রাজনৈতিক কাঠামোর শেষ প্রান্তের অপারেটিভ মাত্র।

চিলির ক্ষেত্রে এই কাঠামো এখন আর অনুমান নয়। রিচার্ড নিক্সন নিজেই সিআইএ প্রধানকে চিলির অর্থনীতিকে ‘চিৎকার করিয়ে ছাড়ার’ নির্দেশ দিয়েছিলেন। লুমুম্বার ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহ এখন নথিতে প্রতিষ্ঠিত– সিআইএ এবং বেলজিয়াম, দুই পক্ষের ভূমিকাই সেখানে স্পষ্ট। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা এত স্পষ্ট কোনো নির্দেশনামা পাইনি। যা পেয়েছি, তা হলো দীর্ঘ এক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা কিছু ইঙ্গিত– ১৯৭১ সালের বেইজিং বৈঠক থেকে শুরু করে ১৯৭৪ সালের খাদ্যসহায়তা আটকে রাখা পর্যন্ত। ১৯৭৫-এ একজন রাষ্ট্রদূতের ব্যক্তিগত সন্দেহ, দূতাবাসের ভেতরের একটি সমান্তরাল যোগাযোগ আর একটি নৈশভোজ, যেখানে ভবিষ্যতের সেনাপ্রধান ও মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা মুখোমুখি বসেছিলেন। এই টুকরোগুলো মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট ধারার আভাস পাওয়া যায়। কিন্তু আভাস আর প্রমাণ এক জিনিস নয়।

এই বইয়ের ভেতর দিয়ে আরেকটা বিষয়ও স্পষ্ট হয়েছে বলে আশা করি। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডকে শুধু বাইরের ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখাও যেমন অগভীর পাঠ হবে, তেমনি একে কেবল কয়েকজন ক্ষুব্ধ মেজরের ব্যক্তিগত প্রতিশোধ হিসেবে দেখলেও পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। মাস্টারমাইন্ড স্তরে ছিল বৃহত্তর বৈশ্বিক কূটনীতির স্বার্থ ও তার সম্ভাব্য প্রভাব। মাঝখানে, অপারেটিভ পর্যায়ে, ছিলেন খন্দকার মোশতাক আর জিয়াউর রহমান– একজন প্রতিষ্ঠাতা-পর্যায়ের রাজনীতিবিদ, যার পুরোনো ঈর্ষা ও ক্ষমতালিপ্সা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় রূপ নিয়েছিল; আরেকজন সেনা কর্মকর্তা, যিনি বঞ্চনার বোধ নিয়ে প্রকাশ্যে আনুগত্যের মুখোশ পরে ছিলেন। এই দুই উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজনীতিবিদ ও সামরিক কর্মকর্তার নীরব যোগসাজশই মাস্টারমাইন্ডদের জন্য কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। তারা নিজেরা হয়তো কখনো কোনো বৈদেশিক শক্তির সরাসরি নির্দেশ পাননি, কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ক্ষমতার লোভ বৃহত্তর কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছিল। ফুটসোলজার স্তরে ছিলেন কয়েকজন তরুণ অফিসার, যাদের ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও অসন্তোষ মিলে গিয়েছিল বৃহত্তর রাজনৈতিক সুযোগের সঙ্গে। এই তিন স্তর আলাদাভাবে দেখলে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের কোনো একটি দিক হয়তো বোঝা যায়; কিন্তু পুরো হত্যাকাণ্ডের জটিলতা ধরা পড়ে না।

মুজিব হত্যাকাণ্ডের পরের ঘটনাপ্রবাহ এই জটিলতাকে আরও গভীর করে তোলে। খুনিরা লিবিয়ায় আশ্রয় পেলেন এমন একজন নেতার কাছে, যিনি চার বছর আগেও বাংলাদেশের জন্মের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। অথচ তিন বছর পর সেই একই নেতা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন। আর ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্ক এক দশকের মধ্যেই এমন স্বাভাবিক হয়ে উঠল যে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেই সেই দেশে রাষ্ট্রীয় সফরে গেলেন। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠতম মিত্র ইন্দিরা গান্ধীর সরকার মুজিব হত্যাকাণ্ডের পর রহস্যজনকভাবে নীরব থাকল। সেই নীরবতার পেছনে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক চাপ আর ভারতের নিজস্ব জরুরি অবস্থার সেন্সরশিপ– দুটোই কাজ করেছিল সমান তালে। এই সব সুতো একসঙ্গে টানলে যে ছবিটা ফুটে ওঠে, তা কোনো পরিষ্কার, একরৈখিক ষড়যন্ত্রের ছবি নয়। বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতির সেই জটিল, প্রায়ই স্ববিরোধী বাস্তবতার ছবি– যেখানে শত্রুর শত্রু কখনো বন্ধু হয়ে ওঠে, আবার সেই বন্ধুত্বের ভিতও অনেক সময় গড়ে ওঠে নিছক সুবিধাবাদী হিসাব-নিকাশের ওপর।

তবু কিছু প্রশ্ন প্রশ্নই থেকে যায়। নিশ্চিত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত সেগুলোকে অমীমাংসিত রেখে এগোনোই বুদ্ধিবৃত্তিক সততা। ফিলিপ চেরি কার নির্দেশে সেই নৈশভোজে বসেছিলেন? ফরটি কমিটির অনুমোদনে, নাকি সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কোনো প্রকাশিত নথি এখনো পাওয়া যায়নি। লিবিয়ার দরজা কেন হঠাৎ খুলে গেল? এটি কি পূর্বপরিকল্পিত ব্যবস্থা ছিল, নাকি সুবিধাবাদী মিত্রতা? এই প্রশ্নেরও কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই। বি. জেড. খসরুর মতো সংযত গবেষকরা এখনো মনে করেন, এই পুরো ঘটনাক্রম মূলত একটি দেশীয় ক্ষমতা-হস্তান্তর; বাইরের শক্তিগুলো এ সম্পর্কে আগে থেকেই জেনে থাকতে পারে, কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ সরাসরি তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। এই অবস্থানকে খারিজ করে দেওয়ার মতো যথেষ্ট প্রমাণ এই বইয়ে নেই।

তবে একটি জায়গায় বাংলাদেশের ইতিহাস লুমুম্বা বা আলেন্দের ইতিহাস থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা। লুমুম্বার হত্যাকারী কিংবা আলেন্দের পতনের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কখনো কোনো ইনডেমনিটি আইন জারি করে বিচার বন্ধ করে দিতে হয়নি; কারণ সেই বিচার শুরু করার মতো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই কখনো তৈরি হয়নি। নৈতিক দায় স্বীকার আর ক্ষমাপ্রার্থনা হয়েছে, কিন্তু প্রকৃত ফৌজদারি বিচার আজও অধরা। বাংলাদেশে ঘটেছিল ঠিক উল্টোটি। প্রথমে ইনডেমনিটি আইন করে সজ্ঞানে বিচারের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল; তারপরও সেই বিচারের দাবি জনমানসে জীবিত ছিল। অনেক দেরিতে হলেও শেষ পর্যন্ত সাধারণ আদালতের মাধ্যমে রায় আসে। বাংলাদেশের অন্তত দুই প্রজন্মের কাছে এই বিচার ছিল দীর্ঘপ্রতীক্ষিত এক জনদাবি; রায় ও দণ্ডের মধ্য দিয়ে সেই দাবি শেষ পর্যন্ত আংশিকভাবে হলেও পূরণ হয়েছিল। লুমুম্বা বা আলেন্দের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেনি।

এই বইয়ের দাবি আসলে খুবই সংযত– বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডকে বাংলাদেশের একটি বিচ্ছিন্ন অভ্যন্তরীণ ঘটনা হিসেবে দেখাটা ইতিহাসের প্রতি অবিচার। লুমুম্বা আর আলেন্দের তালিকায় বঙ্গবন্ধুর নাম রাখার মতো যথেষ্ট ঐতিহাসিক উপাদান, ঘটনাপ্রবাহের সাদৃশ্য ও প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপট আমাদের হাতে আছে। তবে এই তুলনার অর্থ এই নয় যে প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর আমরা পেয়ে গেছি। এর অর্থ হলো, এই হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে এমন কিছু প্রশ্ন রয়েছে, যেগুলো আরও গভীরভাবে অনুসন্ধানের দাবি রাখে। আর সেই প্রশ্নগুলো তোলা কোনো ষড়যন্ত্রতত্ত্বের চর্চা নয়; বরং ইতিহাস অনুসন্ধানেরই একটি স্বাভাবিক অংশ।

শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে ইতিহাসে থাকবেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর গল্পটা যদি শুধু একটি দেশের সীমানার ভেতরে আটকে রাখা হয়, তাহলে সেই গল্পের একটি বড় অংশ অপঠিত থেকে যাবে। এই বই সেই অপঠিত অংশটুকু খুলে দেখানোর একটি চেষ্টা মাত্র। চূড়ান্ত রায় দেওয়ার ভারটা পাঠকের ওপরই রইল।

উৎস ও নথি

তথ্যসূত্র

এই বইয়ে ব্যবহৃত উৎসসমূহ, অধ্যায় অনুযায়ী সাজানো। ডিক্লাসিফাইড মার্কিন তারবার্তা, সিনেট কমিটির রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক গবেষণা, দেশীয় আইনি নথি ও সমসাময়িক সংবাদপত্র — যেখানে কোনো দাবি একটিমাত্র সূত্রের ওপর দাঁড়িয়ে বা স্বাধীনভাবে যাচাই-অপেক্ষিত, তা মূল লেখাতেই উল্লেখ করা হয়েছে।

ভূমিকা

  1. Church Committee (US Senate Select Committee to Study Governmental Operations with Respect to Intelligence Activities), “Alleged Assassination Plots Involving Foreign Leaders,” Interim Report, 20 November 1975.
  2. National Security Archive, briefing book on the 50th anniversary of the Church Committee report, November–December 2025.

অধ্যায় ১ · ত্রিভুজের ভেতর এক নতুন দেশ

  1. U.S. Department of State, Foreign Relations of the United States (FRUS), 1969–1976, Volume XVII, China 1969–1972 — record of the Kissinger–Zhou Enlai talks, Beijing, 9–11 July 1971.
  2. FRUS, South Asia Crisis, 1971 volume — Chinese statements on East Pakistan, March–April 1971; Dawn (Karachi), 13 April 1971, on Zhou Enlai’s letter to Yahya Khan.
  3. FRUS, 1969–1976, Volume E-7, Documents on South Asia, 1969–1972 — cables 400, 403, 406, 417 on Consul General Herbert D. Spivack, Foreign Minister Abdus Samad Azad, and US recognition of Bangladesh, February–April 1972.
  4. Rehman Sobhan, published accounts (1979, 1991) on the 1974 PL-480 food aid suspension linked to Bangladesh’s jute sale to Cuba.
  5. United Nations Archives, records of UNROD/UNROB (1971–1973); FRUS 1969–1976, Volume E-7, Document 427 (Kissinger memorandum to Nixon on US relief contributions, 1972).
  6. B. Z. Khasru, The Bangladesh Military Coup and the CIA Link (2012), on US pressure via India regarding the trial of 195 Pakistani POWs; 1974 tripartite agreement between Bangladesh, India and Pakistan.
  7. শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ, ৩১ জানুয়ারি ১৯৭২ (ঢাকা স্টেডিয়াম), ৪ মার্চ ১৯৭৪ (বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি, কুমিল্লা), এবং ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ (জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ)।
  8. দ্য অর্গানাইজার (ভারত), ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সংখ্যা — এই দাবিটি একটিমাত্র সাময়িকীর প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে, স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
  9. লেখকের নিজস্ব গবেষণা ও সংগ্রহ থেকে প্রাপ্ত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট।

অধ্যায় ২ · এক মুঠোয় বাঁধা সুতো

  1. Lawrence Lifschultz, “A long road in search of the truth,” Dhaka Tribune, 2015–2016 series on the 15 August 1975 coup.
  2. Christopher Hitchens, The Trial of Henry Kissinger (London: Verso, 2001), chapter on Bangladesh.
  3. B. Z. Khasru, The Bangladesh Military Coup and the CIA Link (Rupa Publications, 2012).
  4. WikiLeaks Public Library of US Diplomacy (PlusD): cables 1975DACCA02243 (8 May 1975), 1975DACCA03941 (15 August 1975), 1975DACCA03964 (16 August 1975).

অধ্যায় ৩ · মাঝখানের মানুষেরা

  1. সমসাময়িক সংবাদপত্র প্রতিবেদন, আহমেদ রফিক এমপিএ (সাঁথিয়া-বেড়া, পাবনা) হত্যা, ডিসেম্বর ১৯৭০।
  2. বাংলাদেশের চীনপন্থী রাজনৈতিক ইতিহাস সংক্রান্ত প্রচলিত তথ্য, ইপিসিপি (এমএল), ইবিসিপি (এমএল), সর্বহারা পার্টি, সিরাজ শিকদার প্রসঙ্গে।
  3. খন্দকার মোশতাক আহমেদের আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠাকালীন (২৩ জুন ১৯৪৯) সহ-সম্পাদক পদ এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য।
  4. জিয়াউর রহমান ও কে এম সফিউল্লাহর অক্টোবর ১৯৭৩ সালের নিয়োগ সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য।
  5. লেখকের নিজস্ব গবেষণা, সামরিক অফিসারদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও ব্যক্তিগত প্রেক্ষাপট সংক্রান্ত (নূর চৌধুরী, ডালিম, ফারুক-রশীদ)।

অধ্যায় ৪ · ভোরের আগে

  1. সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী ও বাকশাল গঠন, ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫।
  2. লেখকের নিজস্ব গবেষণা, বাকশালের ত্রিদলীয় (আওয়ামী লীগ, মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ-মোজাফফর) গঠন এবং জিয়াউর রহমানের সদস্যপদ আবেদন সংক্রান্ত।
  3. মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান ও কর্নেল খন্দকার আবদুর রশীদের পরবর্তী সাক্ষাৎকার, ২০ মার্চ ১৯৭৫ সালের বৈঠক প্রসঙ্গে।
  4. WikiLeaks PlusD, cable 1975DACCA03941, 15 আগস্ট 1975।
  5. কে এম সফিউল্লাহর প্রকাশিত সাক্ষাৎকার ও স্মৃতিচারণ।
  6. ফারুক রহমান ও খন্দকার আবদুর রশীদের সাক্ষাৎকার, ইংল্যান্ডের আইটিভি চ্যানেল, আগস্ট ১৯৭৬।
  7. ব্রিগেডিয়ার শাফায়াত জামিলের সাক্ষাৎকার ও স্মৃতিচারণ, ১৫ আগস্ট সকালে জিয়াউর রহমানের প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে; মতিউর রহমান, ১৫ আগস্ট হত্যাকান্ড: কে এম সফিউল্লাহ ও শাফায়াত জামিল বিতর্ক।

অধ্যায় ৫ · পুরস্কার ও দায়মুক্তি

  1. বাংলা উইকিপিডিয়া, “বাংলাদেশ–লিবিয়া সম্পর্ক”, ১৯৭১ সালে লিবিয়ার এফ-৫ বিমান ও গাদ্দাফি-ইন্দিরা চিঠি বিনিময় প্রসঙ্গে।
  2. Freedom First, No. 240 (May 1972), Democratic Research Service, Bombay — Indira Gandhi–Gaddafi correspondence, translated from Al-Hayat (Beirut).
  3. voiceof71bangla.blogspot.com এবং jugantor.com প্রতিবেদন, ১৯৭৪ সালের লাহোর ওআইসি সম্মেলনে গাদ্দাফির মধ্যস্থতা প্রসঙ্গে।
  4. Embassy of India, Tunis, “India–Libya Bilateral Relations,” 1984 সালে ইন্দিরা গান্ধীর লিবিয়া সফর প্রসঙ্গে।
  5. David Bergman, Bangladesh Politico blog / New Age — declassified US cables on pressure regarding Indian press coverage after August 1975.
  6. রাজীব শর্মা, “Gaddafi And The Killers Of Sheikh Mujibur Rahman,” Eurasia Review, সেপ্টেম্বর ২০১১।
  7. বিডি-প্রতিদিন (bd-pratidin.com), বাংলাপিডিয়া, এবং বাংলা উইকিপিডিয়া, চতুর্থ ও ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফ্রিডম পার্টির ফলাফল প্রসঙ্গে।
  8. ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স ১৯৭৫ (অধ্যাদেশ নং ৫০), ইনডেমনিটি (রিপিল) আইন ১৯৯৬; শাহরিয়ার রশিদ খান বনাম বাংলাদেশ, ১৮ বিএলডি (এডি) ১৫৫ এবং ১৭ বিএলডি (এইচসিডি) ১১৩।
  9. bdnews24.com বাংলা সংস্করণ, “ঢাকা টু লিবিয়া: মার্কিন দলিলে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশত্যাগ ও পুনর্বাসন” ধারাবাহিক প্রতিবেদন, ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালের ঘটনাক্রম ও মার্কিন দূতাবাসের তারবার্তার ভিত্তিতে।
  10. বাংলাদেশ কোলাবরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল) অর্ডার ১৯৭২ (দালাল আইন) সংক্রান্ত প্রকাশিত প্রতিবেদন ও ইতিহাস। আইন বাতিলের তারিখ ৩১ ডিসেম্বর ১৯৭৫, জিয়াউর রহমানের নির্দেশে, দুটো স্বাধীন সোর্সে সমর্থিত (একটি একাডেমিক গবেষণাপত্র সহ)। জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম, পিডিপি পুনর্বাসন ও গোলাম আজমের প্রত্যাবর্তন সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য। এম জি তাওয়াবের বিমানবাহিনী প্রধান নিয়োগ এবং ৭ মার্চ ১৯৭৬ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সমাবেশ প্রসঙ্গ লেখকের নিজস্ব তথ্য, স্বাধীন সোর্স দিয়ে সমর্থন প্রয়োজন।
  11. আহমদ ছফা ও গাদ্দাফির বাংলাদেশ-সংযোগ সংক্রান্ত তথ্যসূত্র: মোরশেদ শফিউল হাসান, বাংলা জার্নাল, ৩য় বর্ষ; দিনু বিল্লাহ, টয় হাউজ থেকে ১৯৭১।

অধ্যায় ৬ · সাধারণ আদালতের অসাধারণ রায়

  1. বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারিক ইতিহাস সংক্রান্ত প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন, দায়রা জজ কাজী গোলাম রসূলের রায় (৮ নভেম্বর ১৯৯৮), আপিল বিভাগের রায় (১৯ নভেম্বর ২০০৯), ফাঁসি কার্যকর (২৮ জানুয়ারি ২০১০)।
  2. ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদের গ্রেপ্তার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর সংক্রান্ত সংবাদ প্রতিবেদন, এপ্রিল ২০২০।
  3. রাজীব শর্মা, Eurasia Review প্রবন্ধ, গাদ্দাফি-হাসিনা চিঠি বিনিময় ও পরবর্তী সম্পদ স্থানান্তর প্রসঙ্গে।
  4. শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্য, ২৮ আগস্ট ২০১১, গাদ্দাফির চিঠির জবাব প্রসঙ্গে।

উপসংহার · তিনটি নাম, একটি প্রশ্ন

  1. Assassination of Patrice Lumumba — Wikipedia; Belgian Parliamentary Commission of Inquiry report (2001); Belgian government apology (February 2002); Brussels criminal court proceedings against Étienne Davignon, 2026.
  2. Church Committee, “Alleged Assassination Plots Involving Foreign Leaders,” 1975, on Lumumba, Castro, and General Schneider (Chile).
  3. US Senate inquiry documents on the 1970 Nixon directive to CIA Director Richard Helms regarding Chile (“make the economy scream”).